
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দিতে এসে আদালত প্রাঙ্গণ থেকে ‘নিখোঁজ’ হওয়া সুখরঞ্জন বালিকে গুমের মামলায় বড় অগ্রগতি হয়েছে। এই ঘটনার অন্যতম অভিযুক্ত ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. ফজলুর রহমানকে আদালত কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন।
আজ শুক্রবার বিকেলে শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব আলম এই আদেশ দেন। তবে শুনানি চলাকালীন সময়ে আসামি ফজলুর রহমানকে মূল এজলাসে হাজির না করে আদালতের হাজতখানায় রাখা হয়েছিল।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার রাতে রাজধানীর বাড্ডা এলাকার নিজ বাসা থেকে সাবেক এই ডিবি কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। গ্রেপ্তারের পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা হয়। আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থার কর্মকর্তা মো. হেলালুল ইসলাম আসামি ফজলুর রহমানকে আদালতে হাজির করে সুখরঞ্জন বালিকে গুমের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন করেন। একই সাথে মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে আটকে রাখার অনুরোধ জানানো হলে আদালত তা মঞ্জুর করেন।
তদন্ত কর্মকর্তার আদালতে জমা দেওয়া আবেদন থেকে জানা যায়, ২০১২ সালের ৫ নভেম্বর সকাল সাড়ে ৯টার দিকে সুখরঞ্জন বালি তাঁর আইনজীবীকে সঙ্গে নিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের পুরোনো হাইকোর্ট ভবনের প্রধান ফটকের সামনে এসে পৌঁছান। ঠিক সেই মুহূর্তেই সেখানে ওঁৎ পেতে থাকা সাদা পোশাকধারী কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে একটি সাদা রঙের ডাবল কেবিন গাড়িতে তুলে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।
তদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) দুটি ডাবল কেবিন গাড়ি নিয়ে তৎকালীন এএসপি ফজলুর রহমান ও তাঁর সহযোগীরা এই অপহরণ বা গুমের ঘটনাটি ঘটিয়েছিলেন। বালিকে তুলে সরাসরি ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে যাওয়া হয়।
আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, অপহরণের পর সুখরঞ্জন বালিকে চোখ বেঁধে প্রায় দুই মাস একটি সম্পূর্ণ অন্ধকার কক্ষে আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে তাঁর ওপর অমানুষিক শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। পরবর্তীতে আইনবহির্ভূতভাবে তাঁকে সীমান্ত পার করে ভারতে পুশব্যাক বা পাঠিয়ে দেওয়া হয়। ভারতের দমদম কেন্দ্রীয় কারাগারে দীর্ঘ পাঁচ বছর বিনা বিচারে আটক থাকার পর বিষয়টি সে দেশের গণমাধ্যমে উঠে আসে। পরবর্তীতে তাঁর ছেলে অপূর্ব বালি ভারতে গিয়ে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাঁকে জামিনে মুক্ত করে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনেন।
২০১২ সালে এই ঘটনার পর তৎকালীন সরকারের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দাবি করেছিল যে, সুখরঞ্জন বালিকে সীমান্ত এলাকায় পাওয়া গেছে। তবে শুরু থেকেই তাঁর পরিবার এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলো অভিযোগ করে আসছিল যে, রাষ্ট্রীয় সংস্থার সহায়তায় ট্রাইব্যুনাল এলাকা থেকেই তাঁকে তুলে নেওয়া হয়েছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পরিস্থিতি আমূল বদলে যায়। একই বছরের ২১ আগস্ট সুখরঞ্জন বালি নিজে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে তৎকালীন সরকারের পক্ষে সাক্ষ্য দিতে অস্বীকৃতি জানানো এবং সাঈদীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দিতে আসার কারণেই তাঁকে এই নির্মম গুম ও নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছিল।
সুখরঞ্জন বালির দায়ের করা এই ঐতিহাসিক অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার (এস কে) সিনহাসহ মোট ৩২ জনের নাম সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আসামিদের তালিকায় আরও রয়েছেন ট্রাইব্যুনালের সাবেক চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম, সাবেক আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ, সাবেক আইন প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, সাবেক বিচারক এ টি ATM ফজলে কবির, ট্রাইব্যুনালের তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা হেলাল উদ্দিন এবং পিরোজপুর-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এ কে এম আউয়াল। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে এই মামলায় আসামি করা হয়েছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.