
বাংলাদেশে ফুটবল বিশ্বকাপ মানেই এক অদ্ভুত উন্মাদনা, যার সিংহভাগ জুড়েই থাকে আকাশী-নীল জার্সির আর্জেন্টিনা। আগামী ৪ জুলাই বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর হাইভোল্টেজ ম্যাচে মাঠে নামছে লিওনেল মেসির দেশ। তবে এবারের প্রতিপক্ষ কোনো চেনা ফুটবল পরাশক্তি নয়, বরং আটলান্টিক মহাসাগরের এক ছোট দ্বীপরাষ্ট্র ‘কেপ ভার্দে’। বাংলাদেশের সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের কাছে এই দেশটির নাম একেবারেই নতুন মনে হতে পারে। তবে অবাক করার মতো তথ্য হলো, মাঠের লড়াইয়ে গ্যালারির সিংহভাগ দর্শক আর্জেন্টিনার পক্ষে থাকলেও, প্রতিপক্ষ কেপ ভার্দের পুরো দলের গায়ে জড়িয়ে থাকবে 'মেড ইন বাংলাদেশ' লেখা জার্সি।
ভৌগোলিক হিসাব মেলালে রোম টু রিও ওয়েবসাইটের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে কেপ ভার্দের দূরত্ব প্রায় ১১ হাজার ৬৬৯ কিলোমিটার। আকাশপথে বিমানে উড়ে যেতেও সময় লাগে প্রায় ২০ ঘণ্টার মতো। সাত সমুদ্র তেরো নদীর ওপারের এই অপরূপ সুন্দর দেশটিকে ফুটবল বিশ্বকাপের কল্যাণে বাংলাদেশের মানুষ নতুন করে চিনলেও, দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ও আবেগীয় সম্পর্ক কিন্তু বেশ পুরোনো এবং গভীর।
খাদ্যপণ্য দিয়ে শুরু, এখন যাচ্ছে ইলেকট্রনিকস জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেপ ভার্দের বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশ ঘটেছিল ২০১০ সালের নভেম্বরে। সে সময় দেশের শীর্ষস্থানীয় শিল্পগ্রুপ প্রাণ-আরএফএল-এর সহযোগী প্রতিষ্ঠান অ্যাগ্রিকালচার মার্কেটিং কোম্পানি মাত্র ১১ হাজার মার্কিন ডলারের খাদ্যপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে এই নতুন বাজারের সূচনা করে। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ধীরে ধীরে হাশেম ফুডস, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় বড় দেশীয় ব্র্যান্ড এই বাজারে যুক্ত হয়।
বর্তমানে কেপ ভার্দেতে প্রাণের চিপস, জুস ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যের পাশাপাশি ওয়ালটনের তৈরি আধুনিক ওয়াশিং মেশিন, ইলেকট্রিক কেটলি এবং ওভেন বেশ সুনামের সঙ্গে রপ্তানি হচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ কেপ ভার্দে থেকে মূলত লোহার স্ক্র্যাপ আমদানি করে থাকে। এনবিআরের সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ এই দেশটিতে প্রায় ২ লাখ ৫১ thousand ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যার বিপরীতে আমদানি ছিল ১ লাখ ১১ thousand ডলারের। ফলে এই বাণিজ্যে বাংলাদেশ বড় ধরনের উদ্বৃত্ত বজায় রেখেছে। প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল জানান, বাজারটি ছোট হলেও সেখানে বাংলাদেশের পণ্যের চাহিদা এবং রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রথমবার বিশ্বকাপেই চমক ও বাংলাদেশের তৈরি অফিশিয়াল জার্সি ফুটবল বিশ্বে কেপ ভার্দে এবারই প্রথম বিশ্বকাপ খেলতে এসে রূপকথার জন্ম দিয়েছে। গ্রুপ পর্বে স্পেন, উরুগুয়ে এবং সৌদি আরবের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে রুখে দিয়ে তারা জায়গা করে নিয়েছে নকআউট পর্ব বা শেষ ৩২-এ। আর এই ফুটবল রূপকথার নেপথ্যে রয়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পের এক বড় অবদান।
চলতি বছর বিশ্বকাপের উন্মাদনাকে কেন্দ্র করে ঢাকার উত্তরার ‘গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলিং লিমিটেড’ কেপ ভার্দের জাতীয় ফুটবল দলের জন্য অফিশিয়াল কিট তৈরি করেছে। এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রায় ১ লাখ ৩০ thousand মার্কিন ডলার মূল্যের ১২ হাজার ৫৭৩টি অফিশিয়াল জার্সি, শার্ট ও জ্যাকেট কেপ ভার্দেতে রপ্তানি করেছে। গত মার্চ মাস থেকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ধাপে ধাপে এই চালানগুলো পাঠানো হয়। গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং অ্যান্ড অ্যাসেম্বলিং লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুশতাক আহমেদ খান বলেন, কেপ ভার্দের জাতীয় দলের অফিশিয়াল কিট সরবরাহকারী বিশ্বখ্যাত ব্র্যান্ড ‘ক্যাপেলি স্পোর্টস’ তাদের মাধ্যমে এই বিশেষ জার্সিগুলো তৈরি করিয়ে নিয়েছে।
৪ জুলাইয়ের মাঠে অদৃশ্য বাংলাদেশ ৪ জুলাইয়ের ম্যাচে কোটি কোটি বাংলাদেশি ভক্তের নজর থাকবে আর্জেন্টিনার জাদুকরী ফুটবল শৈলীর ওপর। তবে ফুটবল মাঠের ৯০ মিনিটের উত্তেজনার মাঝেও বাংলাদেশের পোশাকশিল্পের এক বিশাল গৌরবগাথা মিশে থাকবে। একদিকে থাকবে শত কোটি ভক্তের হৃদয়ে থাকা আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে থাকবে বাংলাদেশের কারখানায় তৈরি জার্সি গায়ে লড়ে যাওয়া কেপ ভার্দের একদল স্বপ্নবাজ ফুটবলার। মাঠের জয়-পরাজয় যাই হোক না কেন, এই বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের এই বৈশ্বিক উপস্থিতি দেশের জন্য এক অনন্য অর্জন।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.