
নিজস্ব প্রতিবেদক: বহুল আলোচিত ‘বালিশ-কাণ্ডের’ রেশ কাটতে না কাটতেই রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসন প্রকল্প ‘গ্রিন সিটি’তে আরও এক বিশাল বড় আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। এবার আবাসন এলাকার ১১টি ভবনের জন্য বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম এবং জেনারেটর কেনাকাটায় বড় ধরনের দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের (সিএজি) কার্যালয়। নিরীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি প্রাক্কলিত দরের চেয়ে প্রায় আট গুণ বেশি দামে এসব যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছে, যার ফলে সরকারের প্রায় ১৮৭ কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের রূপপুর প্রকল্পের এই আবাসিক ভবনগুলো আমানতভিত্তিকভাবে নির্মাণ ও বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে পাবনা গণপূর্ত বিভাগ ই-জিপি প্রক্রিয়ায় ১১টি ভবনের বাহ্যিক বিদ্যুতায়নের জন্য দরপত্র আহ্বান করে। এই কাজের মূল পরিধির মধ্যে ছিল ১,৬০০ কেভিএ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র, জেনারেটর, লিফট, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ও সোলার প্যানেল স্থাপন।
নিরীক্ষকেরা দরপত্র বিশ্লেষণ করে দেখেছেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো অত্যন্ত চতুরতার সাথে বিদ্যুৎ উপকেন্দ্রের সরঞ্জাম ও জেনারেটরের দাম অস্বাভাবিকভাবে বাড়িয়ে ধরে। অথচ চোখ ফাঁকি দেওয়ার জন্য শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রসহ কয়েকটি খুচরা পণ্যের দাম কম দেখানো হয়। এর ফলে দরপত্রের মোট মূল্য দাপ্তরিক প্রাক্কলনের কাছাকাছি (মাত্র ০.০০২% কম) থাকে, যাতে বাইরে থেকে সাধারণ দৃষ্টিতে দরপত্রটিকে বৈধ ও গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কিন্তু ভেতরে নির্দিষ্ট কিছু পণ্যে শত গুণ পর্যন্ত দাম বাড়িয়ে সরকারের অর্থ লোপাট করা হয়েছে।
সিএজির প্রতিবেদনে ৭ নম্বর ভবনের একটি স্পষ্ট উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এই ভবনের উচ্চ ভোল্টেজ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের সরকারি দর ছিল মাত্র ১০ লাখ৩২ হাজার টাকা, অথচ বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। একইভাবে, ৪০ লাখ ৪০ হাজার টাকার একটি ট্রান্সফরমারের দাম ধরা হয়েছে ৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
নিম্ন ভোল্টেজের বিদ্যুৎ নিয়ন্ত্রণ সরঞ্জামের জন্য ১৬ লাখ ৩১ হাজার টাকার বিপরীতে ৩ কোটি ২ লাখ টাকা এবং ১০ লাখ টাকার পাওয়ার ফ্যাক্টর ইমপ্রুভমেন্ট (PFI) প্যানেলের জন্য ২ কোটি টাকা বিল করা হয়েছে। এছাড়া ১ কোটি ৬৮ লাখ টাকার দুটি জেনারেটরের পেছনে খরচ দেখানো হয়েছে ৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে ১ কোটি ৮৪ লাখ টাকার যন্ত্রপাতির জন্য একটি ভবনেই বিল তোলা হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অর্থাৎ, কেবল একটি ভবনেই অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৭ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
নথি অনুযায়ী, এই বিশাল অনিয়মের সুবিধাভোগী মূলত তিনটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।
মজিদ সন্স কনস্ট্রাকশন লিমিটেড: পাঁচটি ভবনের কাজের জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে ৯২ কোটি টাকা দেওয়া হয়, যার প্রকৃত সরকারি মূল্য ছিল ১২ কোটি ২৭ লাখ টাকা (অতিরিক্ত ৭৯ কোটি ৭৩ লাখ টাকা)।
সাজিন এন্টারপ্রাইজ: চারটি ভবনের কাজের বিপরীতে ৮২ কোটি ৪৯ লাখ টাকা দেওয়া হয়, যার সরকারি মূল্য ছিল ৯ কোটি ৮২ লাখ টাকা (অতিরিক্ত ৭২ কোটি ৬৭ লাখ টাকা)।
এমএসসিএল-জিকেবিপিএল (যৌথ উদ্যোগ): দুটি ভবনের কাজের জন্য ৩৯ কোটি ৩৯ লাখ টাকা পরিশোধ করা হয়, যার আসল মূল্য ছিল ৪ কোটি ৯১ লাখ টাকা (অতিরিক্ত ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা)।
সব মিলিয়ে সরকারি দর অনুযায়ী যেখানে ২৬ কোটি baggy ৯৯ লাখ টাকা পরিশোধ করার কথা ছিল, সেখানে এই তিন ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে ২১৩ কোটি ৮৯ লাখ টাকা।
সরকারি ক্রয় বিধিমালা (PPR) অনুযায়ী, কোনো দরদাতা অস্বাভাবিক দাম প্রস্তাব করলে দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির ব্যাখ্যা চাওয়ার বা জামানত বাড়ানোর নিয়ম রয়েছে। কিন্তু তৎকালীন মূল্যায়ন কমিটি কোনো নিয়মই তোয়াক্কা করেনি। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির তৎকালীন সভাপতি ও রাজশাহী গণপূর্ত জোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. নজিবর রহমান এবং সদস্যসচিব মোহাম্মদ মাসুদুল আলমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো যাচাই-বাছাই ছাড়াই এই বিল অনুমোদন করেন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান এই ঘটনাকে একটি ‘মেগা দুর্নীতি’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি জানান, দেশের চলমান মেগা প্রকল্পগুলোতে সুশাসনের অভাব ও আমলাতান্ত্রিক জবাবদিহিতা না থাকার কারণেই এমন আর্থিক লুটপাট সম্ভব হচ্ছে। এই দুর্নীতির পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত করে দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং লুটপাট হওয়া ১৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত আনার সুপারিশ করেছে সিএজি।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.