
দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক মুক্তি ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে সুদভিত্তিক অর্থনীতির অবসান ঘটিয়ে ‘জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি’ চালুর জোর দাবি জানানো হয়েছে জাতীয় সংসদে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে এই দাবি উত্থাপন করেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) মুজিবুর রহমান। রোববার জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বাজেট বক্তৃতায় তিনি দেশের অর্থনৈতিক সংস্কারের জন্য একটি স্বতন্ত্র 'জাকাত মন্ত্রণালয়' গঠন এবং বিভিন্ন মাজহাবের আলেমদের সমন্বয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন।
সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান তার বক্তৃতায় দেশের বিদ্যমান সুদি ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “বাংলাদেশে সুদ ছাড়াই অর্থনীতি সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করা সম্ভব। আমাদের এখন সময় এসেছে সুদভিত্তিক অর্থনীতির কবর রচনা করে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি চালু করার।” পবিত্র কোরআন ও হাদিসের বাণী উদ্ধৃত করে তিনি জাতীয় সংসদে ঋণ এবং সুদের ভয়াবহ কুফল ও এর ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞার বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, আল্লাহ তায়ালা সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং জাকাত ও সাদকাকে ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি করেন।
বাংলাদেশে ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থার অতীত সাফল্য এবং বর্তমান সংকটের কথা উল্লেখ করে মুজিবুর রহমান বলেন, “বাংলাদেশে সুদ বন্ধ করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী অর্থনীতি চালুর একটি সফল ও কার্যকর প্রচেষ্টা চালিয়েছিল ইসলামী ব্যাংক। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, একটি বিশেষ ‘শকুনের দৃষ্টি’ এই ব্যাংকের ওপর পড়ার কারণে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় ও সফল এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি আজ প্রায় বিধ্বস্ত হতে চলেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, যখন ইসলামী ব্যাংক দেশের অর্থনীতিতে সততা ও সফলতার সঙ্গে অবদান রাখছিল, তখন প্রচলিত বড় বড় সুদি ব্যাংকগুলো ব্যবসায়িক টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে নিজেদের প্রতিষ্ঠানে ‘ইসলামিক উইন্ডো’ বা ‘ইসলামিক কাউন্টার’ চালু করেছিল। এই ঘটনাটিই প্রমাণ করে যে, বাংলাদেশের মানুষ সুদমুক্ত ব্যাংকিং পছন্দ করে এবং এ দেশে সুদ ছাড়াই সফলভাবে অর্থনীতি চালানো সম্ভব।
বাজেট আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক মালয়েশিয়া সফরের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত এমপি বলেন, মালয়েশিয়ায় সুদ ব্যবস্থা ক্রমান্বয়ে বন্ধ করে জাকাতভিত্তিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার একটি দারুণ প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। শুধু মালয়েশিয়াই নয়, বর্তমান বিশ্বে ইরান, বাহরাইন, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত, কাতার এবং পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রগুলোও সুদ বন্ধ করে জাকাতভিত্তিক অর্থনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানোর জন্য নানামুখী চেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশ মুসলিম প্রধান দেশ হিসেবে এই মডেল সহজেই গ্রহণ করতে পারে।
মুজিবুর রহমান দাবি করেন, বাংলাদেশে যদি সুপরিকল্পিত ও সরকারি ব্যবস্থাপনায় সঠিকভাবে জাকাত আদায় ও বণ্টন করা যায়, তবে প্রতি বছর প্রায় দুই লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আয় করা সম্ভব। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ দিয়ে দেশের দারিদ্র্য বিমোচন এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভাগ্য উন্নয়ন করা সম্ভব। আর এই প্রক্রিয়াকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতেই তিনি অবিলম্বে দেশে একটি স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ‘জাকাত মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান।
সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায়distributed কৃষক কার্ড ও ফ্যামিলি কার্ডের প্রসঙ্গ তুলে ধরে এই সংসদ সদস্য বলেন, “দেশের সাধারণ মানুষ বা প্রান্তিক জনগণ শুধু কার্ড বা সাময়িক সাহায্য চায় না, তারা চায় স্থায়ী কাজ। জনগণের হাতে কাজের সুযোগ তৈরি করে দিতে হবে।” তিনি সরকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, জনগণকে আত্মনির্ভরশীল ও দারিদ্র্যমুক্ত করতে হলে কার্ড সংস্কৃতির চেয়ে টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বেশি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন। তবেই এই জাতিকে প্রকৃত অর্থে দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করা সম্ভব হবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.