বাংলাদেশ ব্যাংক ফাইল ছবি

দেশের সাধারণ মানুষ, প্রবাসী এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের জন্য সম্পূর্ণ নিরাপদ ও শরিয়াহসম্মত উপায়ে সরকারি তহবিলে বিনিয়োগের একটি দুর্দান্ত সুযোগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশের ইতিহাসে এই প্রথম বারের মতো স্বল্পমেয়াদি ‘বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’ ইস্যু করতে যাচ্ছে সরকার। মাত্র ২৭৩ দিন বা প্রায় ৯ মাস মেয়াদের এই বিশেষ শরিয়াহ বন্ডে বিনিয়োগ করে আকর্ষনীয় মুনাফা আয়ের সুযোগ পাবেন বিনিয়োগকারীরা।
আগামীকাল রোববার সকাল ১০টা থেকে দুপুর ৩টা পর্যন্ত এই সুকুকের জন্য আবেদন জমা নেওয়া হবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বাজার থেকে মোট ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এর বিপরীতে বিনিয়োগকারীদের বার্ষিক ৯ দশমিক ৩৬ শতাংশ হারে নিশ্চিত মুনাফা প্রদান করা হবে।
সাধারণত বাংলাদেশে এর আগে যেসব সরকারি সুকুক বন্ড বাজারে এসেছে, সেগুলোর মেয়াদ ছিল তুলনামূলক দীর্ঘ— যেমন ৫ বছর, ৭ বছর কিংবা ১০ বছর। দীর্ঘ সময় টাকা আটকে থাকার ভয়ে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকারী শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যবস্থায় অংশ নিতে পারতেন না। বিনিয়োগকারীদের এই চাহিদার কথা মাথায় রেখেই বাংলাদেশ ব্যাংক এবার এই স্বল্পমেয়াদি ‘ইজারা সুকুক’ নিয়ে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, ২৭৩ দিনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বিনিয়োগকারীরা তাদের মূল অর্থ বা আসলের সঙ্গে এককালীন অর্জিত মুনাফা পেয়ে যাবেন।
এই সুকুক বন্ডে অংশ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত সহজ ও সর্বজনীন করা হয়েছে। বাংলাদেশের যেকোনো সাধারণ নাগরিক, প্রবাসী বাংলাদেশি (NRB) এবং যেকোনো দেশীয় প্রতিষ্ঠান এখানে বিনিয়োগ করতে পারবে। এই বন্ডে সর্বনিম্ন বিনিয়োগের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ১০ হাজার টাকা। ফলে মধ্যবিত্ত বা ক্ষুদ্র সঞ্চয়কারীরাও খুব সহজে এখানে অংশ নিতে পারবেন।
আবেদনের প্রক্রিয়া: বিনিয়োগ করতে আগ্রহী ব্যক্তিদের যেকোনো তালিকাভুক্ত ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে নিজস্ব অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে আবেদন সম্পন্ন করতে হবে। সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘শরিয়াহ সিকিউরিটিজ মডিউল (এসএসএম)’-এর অধীনে নিলাম ও বরাদ্দের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে।
যাঁরা একদম প্রথমবারের মতো সরকারি সুকুক বন্ডে বিনিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, তাঁদের আবেদনের পূর্বে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের মাধ্যমে একটি ‘সুকুক ইনভেস্টর (এসআই) আইডি’ বা পরিচয় নম্বর খুলে নিতে হবে। তবে যাঁদের আগে থেকেই সরকারি সুকুকে বিনিয়োগের অভিজ্ঞতা আছে এবং এসআই আইডি করা আছে, তাঁদের নতুন করে কোনো আইডি খোলার প্রয়োজন পড়বে না। এছাড়া অন্যান্য প্রচলিত সরকারি সিকিউরিটিজের মতো এই স্বল্পমেয়াদি সুকুকটিতেও ব্যাংকগুলোর জন্য রেপো (Repo) সুবিধা বহাল থাকবে।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, সাধারণ বন্ডের সাথে সুকুকের পার্থক্য কী? সহজ কথায়, সুকুক হলো একটি শরিয়াহসম্মত ইসলামি বন্ড। এটি প্রচলিত সুদভিত্তিক বন্ডের সম্পূর্ণ বিকল্প ও বৈধ একটি মাধ্যম। সাধারণ বন্ডে বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারীরা নির্দিষ্ট হারে সুদ পেয়ে থাকেন, যা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে, সুকুকের ক্ষেত্রে বিনিয়োগের অর্থ কোনো নির্দিষ্ট দৃশ্যমান সম্পদ বা উন্নয়নমূলক প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়। বিনিয়োগকারীরা ওই নির্দিষ্ট সম্পদ বা প্রকল্পের মালিকানার অংশীদার হন। সেই সম্পদ থেকে অর্জিত ভাড়া (ইজারা) বা আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ বিনিয়োগকারীদের মাঝে মুনাফা হিসেবে বণ্টন করা হয়। ‘সুকুক’ মূলত একটি আরবি শব্দ, যার অর্থ হলো সিলমোহরযুক্ত কোনো আইনি দলিল বা সার্টিফিকেটের মাধ্যমে সম্পদের ওপর মালিকানার প্রমাণ দেওয়া।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুদারাবা, মুশারাকা, মুরাবাহা এবং ইজারা সহ বিভিন্ন পদ্ধতিতে সুকুক পরিচালিত হয়ে থাকে। বাংলাদেশে বর্তমানের এই স্বল্পমেয়াদি সুকুকটি মূলত ‘ইজারা সুকুক’ মডেলে তৈরি।
বাংলাদেশে ২০২০ সালে প্রথমবার উন্নয়নমূলক কাজের অর্থায়নের জন্য ‘বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগ সুকুক (বিজিআইএস)’ এর যাত্রা শুরু হয়। সে সময় অর্থ বিভাগ সারা দেশে নিরাপদ পানি সরবরাহের মতো মেগা প্রকল্পসহ মোট ৬৮টি উন্নয়ন প্রকল্পের একটি তালিকা তৈরি করেছিল। প্রথম দফায় ৮ হাজার কোটি টাকার সুকুক ছাড়ার পর থেকে দেশের অবকাঠামো উন্নয়নে এটি বড় ভূমিকা রাখছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২০ থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন মেয়াদে সুকুক ছাড়ার মাধ্যমে সরকার ইতোমধ্যে মোট ৪২ হাজার ৪০০ কোটি টাকা সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি নিলামের মাধ্যমে এসেছে ৩২… হাজার ৪০০ কোটি টাকা এবং বিশেষ ব্যবস্থার (প্রাইভেট প্লেসমেন্ট) মাধ্যমে সংগৃহীত হয়েছে ১০… হাজার কোটি টাকা।
সুকুক ব্যবস্থা এখন আর কেবল মুসলিম দেশগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি একটি বৈশ্বিক স্বীকৃত আধুনিক অর্থায়ন ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সুকুক ব্যবহারের দিক থেকে বর্তমানে বিশ্বে শীর্ষস্থানে রয়েছে মালয়েশিয়া। এছাড়া সৌদি আরব, বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, কাতার, পাকিস্তান, সিঙ্গাপুর এবং এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুঁজিবাজারেও সুকুক বন্ড অত্যন্ত জনপ্রিয় মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্ব বাজারে সচল থাকা মোট সুকুকের পরিমাণ ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে এবং প্রতি বছর বৈশ্বিক বাজারে প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলারের নতুন সুকুক যুক্ত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা আশা করছেন, এই নতুন স্বল্পমেয়াদি সুকুকটি দেশের শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগকারীদের জন্য যেমন একটি অত্যন্ত নিরাপদ ও লাভজনক বিনিয়োগের দুয়ার খুলে দেবে, ঠিক তেমনি সরকারও কম সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সহজে ও কম খরচে বাজার থেকে সংগ্রহ করতে পারবে।