
সন্ধ্যা তখন কেবল নেমে এসেছে। চারপাশটা মাত্র শান্ত হতে শুরু করেছিল। ঠিক তখনই হঠাৎ একটি অডিও বার্তা বদলে দিল পুরো পরিস্থিতি। ভীতি আর আতঙ্কে কাঁপানো কণ্ঠে ওপাশ থেকে ভেসে এল—‘বাড়িটা ভয়ংকরভাবে কেঁপে উঠল, এখনো কাঁপছে।’ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে কর্মরত বিবিসির সাংবাদিক ভ্যালেন্তিনা ওরোপেজার মুঠোফোনে এই বার্তাটি পাঠিয়েছিলেন তাঁর বোন ভেরোনিকা। ভেরোনিকা তখন ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে তাঁদের মায়ের সাথেই ছিলেন। শত শত মাইল দূরে থাকা ভ্যালেন্তিনা তখনো বুঝতে পারেননি, তাঁর প্রিয় শহর কারাকাস মাত্র কয়েক মুহূর্ত আগে এক প্রলয়ংকরী জোড়া ভূমিকম্পের মুখোমুখি হয়েছে।
ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাস ও এর আশপাশের অঞ্চলে স্থানীয় সময় বুধবার সন্ধ্যা ৬টার পর আঘাত হেনেছে অত্যন্ত শক্তিশালী ও বিধ্বংসী জোড়া ভূমিকম্প। মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে পরপর দুটি শক্তিশালী কম্পন পুরো দেশকে লণ্ডভণ্ড করে দেয়। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, প্রথম ভূমিকম্পটি আঘাত হানে স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪ মিনিটে, যার মাত্রা ছিল রিখটার স্কেলে ৭.২। এর কেন্দ্রস্থল ছিল কারাকাস থেকে প্রায় ১৬৮ কিলোমিটার পশ্চিমে সান ফেলিপে নামক স্থানে। এর ঠিক ৩৯ সেকেন্ড পর কারাকাসের পশ্চিমে ইউমারের কাছে ৭.৫ মাত্রার দ্বিতীয় শক্তিশালী ভূমিকম্পটি আঘাত হানে।
ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি ও মৃত্যুর আশঙ্কা
ইউএসজিএস-এর প্রাথমিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এই জোড়া ভূমিকম্পের ফলে ভেনেজুয়েলায় ব্যাপক হতাহত ও সুদূরপ্রসারী ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে। সংস্থার পক্ষ থেকে ধারণা করা হচ্ছে, মৃতের সংখ্যা ১০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লাখ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। ভেনেজুয়েলার অন্তর্বর্তীকালীন বা ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া এক জরুরি ভাষণে তিনি জানান, এখন পর্যন্ত ৩২ জন নিহত এবং প্রায় ৭০০ জন আহত হওয়ার খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে। ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ যত এগোবে, এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আতঙ্কের সেই দুই ঘণ্টা
দূরদেশে বসে বোনের সেই আর্তনাদ শোনার পর ভ্যালেন্তিনা বারবার ফোন করার চেষ্টা করেন বোন ও মাকে। কিন্তু ফোনের ওপাশ থেকে কোনো সাড়া মিলছিল না। একে একে কেটে যায় দীর্ঘ দুই ঘণ্টা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও সাংবাদিকদের চ্যাট গ্রুপে তখন কেবলই ধ্বংসের ছবি আর ভিডিওর বন্যা। লস পালোস গ্রান্দেস এলাকার একটি বহুতল ভবন বিস্কুটের মতো ভেঙে গুঁড়ো হয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও দেখে ভ্যালেন্তিনার বুক কেঁপে ওঠে; কারণ ভবনটি ছিল তাঁর মায়ের বাসা থেকে মাত্র কয়েক মিটার দূরে। ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় ভেনেজুয়েলার লাখ লাখ মানুষ সাময়িকভাবে যোগাযোগবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন। অবশেষে দুই ঘণ্টা পর ভেরোনিকার ফোন আসে। শুধু বলতে পেরেছিলেন, "বোন, আমি ভেবেছিলাম আমরা মারা যাচ্ছি।" এরপরই সংযোগ কেটে যায়। বেঁচে থাকার স্বস্তি মিললেও নিজের চেনা ঘরটি অক্ষত আছে কি না, তা এখনো জানেন না ভ্যালেন্তিনা।
স্তব্ধ কারাকাস, চলছে উদ্ধার অভিযান
ভূমিকম্পের পরপরই সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকায় সুনামি সতর্কতা জারি করা হলেও পরিস্থিতি বিবেচনা করে দ্রুত তা তুলে নেওয়া হয়। তবে কারাকাস শহরের চিত্র এখন সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপের মতো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবিতে দেখা গেছে, শহরের বড় বড় ভবন ধসে পড়েছে, মানুষ আতঙ্কে রাস্তায় রাত কাটাচ্ছে এবং উদ্ধারকর্মীরা হন্যে হয়ে ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত মানুষদের খুঁজছেন। হাসপাতালগুলোতে আহত মানুষের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে চিকিৎসকেরা হিমশিম খাচ্ছেন।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কারাকাসের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। একই সাথে দেশের সমস্ত বিদ্যালয় ও রেলসেবা স্থগিত রাখা হয়েছে। প্রেসিডেন্ট দেলসি রদ্রিগেজ দেশবাসীকে শান্ত থাকার এবং উদ্ধারকাজে প্রশাসনকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন। ভূমিকম্পের কম্পন থেমে গেলেও, আতঙ্ক ও প্রিয়জন হারানোর ভয় এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে গোটা ভেনেজুয়েলাকে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.