ছবিঃ সংগৃহীত

বর্তমান সময়ে প্রযুক্তির অপব্যবহারের অন্যতম বড় একটি খাত হয়ে দাঁড়িয়েছে অনলাইন জুয়া ও ডিজিটাল বেটিং। দেশের তরুণ সমাজ থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ প্রতিনিয়ত এই মরণনেশায় জড়িয়ে পড়ছে। একই সাথে ক্রীড়াঙ্গনে ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিংয়ের মতো অপরাধ দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে। এই ধরনের অপরাধের বিস্তার কঠোর হস্তে দমন করতে অবশেষে আইনি কাঠামোতে যুগোপযোগী ও বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার।
ব্রিটিশ আমলের পুরোনো আইন বাতিল করে দেশে অনলাইন জুয়া, ডিজিটাল বেটিং এবং খেলাধুলায় ফিক্সিং রোধে জাতীয় সংসদে নতুন একটি বিল আনা হয়েছে। দীর্ঘ ১৫৯ বছরের পুরোনো ১৮৬৭ সালের ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ রহিত করে আধুনিক ও কঠোর ধারা সংবলিত ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল-২০২৬’ সংসদে উত্থাপন করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২৩ জুন) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এই গুরুত্বপূর্ণ বিলটি উত্থাপন করেন। বিলটি সংসদে আসার পর তা আরও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন রয়েছে বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর পরীক্ষা শেষে আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য বিলটি আইন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়েছে।
প্রস্তাবিত এই নতুন আইনে অপরাধের পরিধি ও প্রযুক্তির আধুনিকায়নকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল-২০২৬’-এ প্রথাগত জুয়ার পাশাপাশি আধুনিক সব ধরনের ডিজিটাল জুয়া, অনলাইন বাজি (বেটিং), ম্যাচ ফিক্সিং কিংবা স্পট ফিক্সিংসহ মোট ২৪ ধরনের বিষয়কে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অপরাধের ধরন ও তীব্রতা বিবেচনা করে এই আইনে মোট ১৪ ধরনের সাজার বিধান রাখা হয়েছে, যা অতীতে কখনো ছিল না।
নতুন বিলে সাধারণ জুয়াড়ি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক চক্রের সাথে জড়িত অনলাইন বেটিং পরিচালনাকারীদের জন্য পৃথক ও কঠোর শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে:
সাধারণ বা প্রথাগত জুয়া: কোনো ব্যক্তি যদি প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে যেকোনো ধরনের প্রচলিত জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত হন, তবে তিনি অনূর্ধ্ব দুই বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ দুই লাখ টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
অনলাইন বা দূরবর্তী জুয়া: বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অনলাইন ক্যাসিনো বা দূরবর্তী জুয়া। বিলে বলা হয়েছে, কেউ যদি অনলাইন জুয়া বা দূরবর্তী কোনো জুয়ার সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন, তবে অপরাধীর পাঁচ বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
অনলাইন বেটিং বা বাজি ধরা: বিভিন্ন অ্যাপ বা ওয়েবসাইটের মাধ্যমে যারা ডিজিটাল বেটিং বা অনলাইন বাজির সাথে যুক্ত থাকবেন বা এটি পরিচালনা করবেন, তাদের ক্ষেত্রে শাস্তি আরও ভয়াবহ। এই অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড অথবা সর্বোচ্চ পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
ম্যাচ ফিক্সিং ও স্পট ফিক্সিং: ক্রীড়াঙ্গনকে কলঙ্কমুক্ত করতে এই বিলে ফিক্সিংকে বড় অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। খেলাধুলায় কোনো ধরনের ম্যাচ ফিক্সিং বা স্পট ফিক্সিংয়ের সঙ্গে কেউ সম্পৃক্ত হলে তার সাজা হবে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড অথবা অনূর্ধ্ব এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড কিংবা উভয় দণ্ড।
১৮৬৭ সালের ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ যখন তৈরি করা হয়েছিল, তখন ইন্টারনেট, স্মার্টফোন কিংবা অনলাইন ক্যাসিনোর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। ফলে ওই পুরোনো আইনে কেবল জুয়ার আড্ডায় সশরীরে উপস্থিত থেকে জুয়া খেলাকেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হতো। এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন বেটিং সাইট ও অ্যাপের মাধ্যমে দেশ থেকে কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছিল। বর্তমান বাস্তবতায় ডিজিটাল অপরাধ রুখতে পুরোনো আইনটি একদমই কার্যকর ছিল না।
রাজনৈতিক ও আইনি বিশ্লেষকদের মতে, ‘জুয়া প্রতিরোধ বিল-২০২৬’ পাস হলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ডিজিটাল অপরাধীদের সহজে শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে পারবে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে এই সামাজিক ব্যাধি থেকে রক্ষা করতে এবং দেশের কোটি কোটি টাকা ও রেমিট্যান্স অবৈধভাবে দেশের বাইরে চলে যাওয়া বন্ধে এই আইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা হচ্ছে।