চার মাজহাবেরই আধিপত্য কেন? ইতিহাসের পাতা থেকে যেভাবে হারিয়ে গেল ইসলামের অন্য ধারাগুলো - Uttorpatro TV হারিয়ে যাওয়া ইসলামি মাজহাবের ইতিহাস: যেভাবে বিলুপ্ত হলো প্রভাবশালী ফিকহি ধারা

চার মাজহাবেরই আধিপত্য কেন? ইতিহাসের পাতা থেকে যেভাবে হারিয়ে গেল ইসলামের অন্য ধারাগুলো

লেখক: প্রতিবেদক ঢাকা
প্রকাশ: June 20, 2026
ছবি: এএফপি

বর্তমান মুসলিম বিশ্বে ইসলামি আইন বা ফিকহ শাস্ত্রের আলোচনা আসতেই স্বাভাবিকভাবেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে বিখ্যাত চার মাজহাবের নাম—হানাফি, মালিকি, শাফেয়ি এবং হাম্বলি। তবে ইসলামের শাস্ত্রীয় ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, এমন এক গৌরবময় সময় ছিল যখন মুসলিম উম্মাহর মাঝে আরও বেশ কয়েকটি প্রভাবশালী ও সুসংগঠিত ফিকহি মাজহাবের অস্তিত্ব ছিল। যেখানে মহান আলেম ও মুজতাহিদগণ প্রতিটি শরিয়তি মাসআলায় নিজস্ব ‘ইজতিহাদি’ বা গবেষণালব্ধ স্বাধীন অভিমত ব্যক্ত করতেন।

বিখ্যাত ইসলামি স্কলার ইমাম জালালুদ্দিন সুয়ুতির বর্ণনা অনুযায়ী, হিজরি পঞ্চম শতকের পূর্ব পর্যন্ত ইসলামি বিশ্বে অন্তত ১০টি সুসংগঠিত ও সক্রিয় মাজহাবের উপস্থিতি ছিল। সাহাবিদের যুগ থেকে শুরু করে ‘তাবে-তাবেয়ি’ পর্যন্ত সময়ের প্রায় প্রত্যেক যুগশ্রেষ্ঠ আলেমেরই নিজস্ব ফকিহি অবস্থান ও অনুসারী ছিল। বিশেষ করে হিজরি দ্বিতীয় ও তৃতীয় শতকে ইসলামি আইনের শাস্ত্রীয় গবেষণা এত বেশি প্রাণবন্ত ও বহুমাত্রিক ছিল যে, নিত্যনতুন সমস্যার সমাধানে ইজতিহাদ বা স্বাধীন আইনি চিন্তা ছিল অত্যন্ত সাবলীল। কিন্তু কালক্রমে সেই ধারাগুলোর একটি বড় অংশই আজ ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। রাজনীতি, যোগ্য উত্তরসূরির অভাব, অসচেতনতা কিংবা সরাসরি সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কারণে এই সমৃদ্ধ মাজহাবগুলো একে একে বিলুপ্ত হয়ে গেছে।

ইমাম আওজায়ির স্বাধীন ধারা উমাইয়া আমলের সিরিয়া ও লেবানন অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী ফকিহ ছিলেন আবদুর রহমান ইবনে আমর আল-আওজায়ি। তাঁর ফকিহি মেধার গভীরতা এতটাই ছিল যে, মদিনার ইমাম মালিক ইবনে আনাসও অনেক সময় নিজের মতের চেয়ে আওজায়ির সিদ্ধান্তকে বেশি অগ্রাধিকার দিতেন। ইমাম আওজায়ি ছিলেন অত্যন্ত সাহসী এবং শাসকের মুখের ওপর সত্য বলতে দ্বিধাহীন। আব্বাসীয় সেনাপতি আবদুল্লাহ ইবনে আলি সিরিয়া বিজয়ের পর যখন ব্যাপক রক্তপাত শুরু করেন, তখন আওজায়ি সরাসরি তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে একে অবৈধ ঘোষণা করেন। এমনকি অমুসলিম প্রজাদের ওপর অতিরিক্ত কর চাপানোর বিরুদ্ধেও তিনি রাজদরবারে লিখিত প্রতিবাদ পাঠিয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সবাই তাঁর জানাজায় অংশ নেয়। সিরিয়া ও আন্দালুসে (স্পেন) দীর্ঘকাল এই মাজহাবের দাপট থাকলেও স্পেনের শাসকেরা মালিকি মাজহাবকে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিলে এবং সিরিয়ায় তাঁর শিষ্যরা কিতাবসমূহ সঠিকভাবে সংরক্ষণ না করায় এই ধারাটি ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়।

ইমাম লাইস ইবনে সাদের হারিয়ে যাওয়া জ্ঞান মিসরের ইতিহাসে সর্বোচ্চ মর্যাদার ফকিহ ও মুহাদ্দিস ছিলেন লাইস ইবনে সাদ। তাঁর জ্ঞান সম্পর্কে ইমাম শাফেয়ি মন্তব্য করেছিলেন, লাইস ইবনে সাদ ফিকহের সূক্ষ্মতার দিক থেকে ইমাম মালিকের চেয়েও বড় ফকিহ ছিলেন, কিন্তু তাঁর যোগ্য শিষ্যেরা তাঁকে ধরে রাখতে পারেনি। লাইস ইবনে সাদ আর্থিকভাবে সচ্ছল হওয়ায় কিতাবের অনুলিপি তৈরির জন্য নিজস্ব লিপিকার রাখলেও, তাঁর মৃত্যুর পর শিষ্যরা ফিকহের শাখা-প্রশাখা বিস্তারে (তাফরি) যোগ্যতা দেখাতে ব্যর্থ হন। ফলে এই জীবন্ত মাজহাবটি একসময় স্থবির সংকলনে পরিণত হয়ে পাঠক ও অনুসারী শূন্য হয়ে পড়ে।

ইমাম তাবারির ‘জারিরি মাজহাব’ ও রাজনৈতিক ট্র্যাজেডি বিশ্ববিখ্যাত ‘তাফসিরে তাবারি’র লেখক আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে জারির আত-তাবারি কেবল একজন মুফাসসিরই ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন একজন স্বাধীন মুজতাহিদ। বাগদাদে তাঁর ‘জারিরি মাজহাব’ বেশ জনপ্রিয় ছিল। তবে ফিকহের কিছু জটিল বিষয়ে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বলের অনুসারীদের সঙ্গে তাঁর মতভেদ তৈরি হলে পরিস্থিতি ঘোলাটে রূপ নেয়। তৎকালীন বাগদাদের একটি কট্টরপন্থী অংশ এই মতভেদকে ব্যক্তিগত ক্ষোভের জায়গায় নিয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অপবাদ রটানো শুরু করে। রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপে জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি কার্যত গৃহবন্দী হয়ে পড়েন। এমনকি দাফনও করতে হয়েছিল রাতের আঁধারে। এই চরম সামাজিক বয়কট তাঁর মাজহাবের ধারাবাহিকতা চিরতরে নষ্ট করে দেয়।

সুফিয়ান সাওরি ও আবু সাউরের ধারা কুফা নগরীর বিখ্যাত ইমাম সুফিয়ান সাওরি ছিলেন স্বাধীনচেতা মেজাজের মানুষ। আব্বাসীয় খলিফা মনসুরের দেওয়া প্রধান বিচারপতির পদ প্রত্যাখ্যান করে তিনি রাষ্ট্রীয় চাপ থেকে বাঁচতে আজীবন আত্মগোপনে কাটান। ফলে তাঁর জ্ঞানকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার মতো কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। অন্যদিকে ইমাম শাফেয়ির শিষ্য আবু সাউর আল-বাগদাদির নিজস্ব ধারা ককেশাস অঞ্চলে জনপ্রিয় হলেও পরবর্তী প্রজন্মের উদাসীনতায় তা আর টিকে থাকেনি।

দীর্ঘস্থায়ী ‘জাহিরি মাজহাব’ ও ইবনে হাজাম বিলুপ্ত হওয়া ধারাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী ছিল দাউদ ইবনে আলি আল-আসফাহানি প্রতিষ্ঠিত ‘জাহিরি মাজহাব’। এই মাজহাবের মূল কথা ছিল—ফিকহে কিয়াস বা যুক্তিভিত্তিক অনুমানের কোনো স্থান নেই, কোরআন ও সুন্নাহর বাহ্যিক অর্থই চূড়ান্ত। স্পেনের বিখ্যাত আলেম ইমাম ইবনে হাজাম আন্দালুসি তাঁর ‘আল-মুহাল্লা’ গ্রন্থের মাধ্যমে এই মাজহাবকে শক্ত ভিত্তি দেন। হিজরি অষ্টম শতাব্দী পর্যন্ত এটিকে পঞ্চম প্রধান মাজহাব মনে করা হতো। কিন্তু ইবনে হাজামের লেখার ধারালো ও আক্রমণাত্মক শৈলীর কারণে সমসাময়িক মালিকি আলেমদের সঙ্গে তাঁর দূরত্ব তৈরি হয় এবং উত্তর আফ্রিকার শাসকেরা তাঁর বই নিষিদ্ধ করলে এই ধারাটিও ছিটকে যায়।

বিলুপ্তির প্রধান ৩টি কারণ ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে এই মাজহাবগুলো হারিয়ে যাওয়ার পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ দৃশ্যমান হয়: ১. লিখিত ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপের অভাব: কোনো ফিকহি ধারা টিকে থাকতে হলে পরবর্তী প্রজন্মকে নতুন সমস্যার আলোকে তার শাখা-প্রশাখা বিস্তার করতে হয়, যা ইমাম লাইসের ক্ষেত্রে হয়নি। ২. রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও বিচারব্যবস্থা: আব্বাসীয় ও উসমানীয় আমলে হানাফি ও শাফেয়ি মাজহাবের আলেমরা প্রধান বিচারপতির (কাজি) পদ পাওয়ায় সাধারণ শিক্ষার্থীরা ক্যারিয়ারের স্বার্থে এই মাজহাবগুলো পড়তে বেশি আগ্রহী হয়। রাষ্ট্রীয় ছায়াহীন বাকি মাজহাবগুলো তাই ছাত্র সংকটে ভোগে। 3. রাজনৈতিক ও সামাজিক নিপীড়ন: ইমাম তাবারির মতো মনীষীদের ওপর সামাজিক ও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা তাঁদের চিন্তাধারার প্রসারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

তবে সাংগঠনিকভাবে বিলুপ্ত হলেও এই মহান মুজতাহিদদের চিন্তা পুরোপুরি মুছে যায়নি। ইমাম ইবনে রুশদের ‘বিদায়াতুল মুজতাহিদ’ কিংবা ইবনে কুদামার ‘আল-মুগনি’র মতো তুলনামূলক ফিকহের বিশ্বস্ত গ্রন্থগুলোতে আজও এই হারিয়ে যাওয়া মাজহাবগুলোর আইনি মতামত অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে সংরক্ষিত রয়েছে, যা আধুনিক যুগের গবেষকদের প্রতিনিয়ত আলোড়িত করছে।