
দেশের প্রধান দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) গত সাড়ে তিন মাস ধরে এক নজিরবিহীন অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অসংখ্য দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ জমা পড়লেও, সেগুলোর একটিরও অনুসন্ধান শুরু করা যাচ্ছে না। বন্ধ রয়েছে নতুন মামলা দায়ের, আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল, অবৈধ সম্পত্তি ক্রোক কিংবা সন্দেহভাজনদের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার মতো অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ আইনি প্রক্রিয়া। মূলত কমিশনের শীর্ষ নেতৃত্বে কেউ না থাকায় স্থবির হয়ে পড়েছে পুরো সংস্থার কার্যক্রম।
দুদকের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, একটি দুর্নীতিবিরোধী সংস্থায় প্রতিদিন গড়ে পাঁচ থেকে ছয়টি নতুন দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়ে। তবে দুদক আইন, ২০০৪ অনুযায়ী, যেকোনো নতুন অনুসন্ধান শুরু করা বা তদন্ত প্রতিবেদন অনুমোদনের জন্য কমিশনের প্রত্যক্ষ অনুমোদন বাধ্যতামূলক। গত ৩ মার্চ দুদকের চেয়ারম্যান এবং দুই কমিশনার একযোগে পদত্যাগ করার পর থেকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার মতো কোনো কর্তৃপক্ষ সংস্থায় নেই। ফলে মাঠপর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা থাকলেও আইনি বাধ্যবাধকতার কারণে শত শত গুরুত্বপূর্ণ ফাইল এখন লাল ফিতার দূরত্বে আটকে আছে।
এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ১০ ডিসেম্বর আবদুল মোমেনকে দুদকের চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁর সঙ্গে কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান সাবেক জেলা জজ মির্জা মুহাম্মদ আলী আকবর আজিজী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ। পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব পেলেও তাঁরা মাত্র এক বছর দুই মাস পরই পদত্যাগ করেন। এই আকস্মিক শূন্যতা পূরণে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা হিসেবে দুদকের সচিবের প্রশাসনিক ক্ষমতা বাড়ানোর একটি প্রস্তাব সরকারের কাছে পাঠানো হলেও তা শেষ পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।
কমিশনের পদত্যাগের আগে যেসব বড় বড় দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের মামলার অনুসন্ধান শুরু হয়েছিল, সেগুলোর অগ্রগতিও এখন থমকে আছে। বিভাগীয় পরিচালক ও মহাপরিচালক পর্যায়ে ফাইল প্রস্তুত হয়ে পড়ে থাকলেও তা অনুমোদনের জন্য ওপরের মহলে পাঠানোর কোনো সুযোগ নেই। দুদকের উপপরিচালক (জনসংযোগ) আখতারুল ইসলাম পরিস্থিতির সত্যতা স্বীকার করে জানান, কমিশন না থাকায় নতুন কোনো আইনি পদক্ষেপ বা মামলা অনুমোদনের সুযোগ বর্তমানে বন্ধ রয়েছে।
আইন অনুযায়ী, কমিশনের পদত্যাগের ৩০ দিনের মধ্যে তা পুনর্গঠন করার কথা থাকলেও, নির্ধারিত সময়ে তা না হলে কী করণীয়, সে বিষয়ে আইনে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা নেই। তবে নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া কিছুটা শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে। ৫ সদস্যের একটি সার্চ কমিটি গঠনের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল ও হাইকোর্ট বিভাগের দুজন বিচারপতিকে মনোনীত করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সার্চ কমিটি গঠনের কাজ চলছে এবং ভবিষ্যতে দুদককে আরও শক্তিশালী করতে নতুন আইন প্রণয়নের আলোচনাও শুরু হয়েছে।
এদিকে, এই দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুর্নীতিবাজদের জন্য একটি অত্যন্ত অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের বড় বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি ও দুর্নীতির তদন্ত চলমান থাকা অবস্থায় এভাবে সাড়ে তিন মাস দুদক অকার্যকর থাকা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, "দুদক সচল না থাকায় আসামিরা তাঁদের অবৈধ সম্পদ বিক্রি করে দেওয়ার বা দেশ থেকে সরিয়ে ফেলার সুবর্ণ সুযোগ পাচ্ছেন। এর ফলে মামলার আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে, যার সুবিধা সরাসরি অপরাধীরা পাবে। এভাবে চলতে থাকলে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের দুর্নীতির ধারণাসূচকে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।"
এই অচলাবস্থা নিয়ে সরকারের তীব্র সমালোচনা করেছেন ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক এবং দুদক সংস্কার কমিশনের সাবেক প্রধান ইফতেখারুজ্জামান। তিনি বলেন, "দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগের পরিবেশ বর্তমান সরকারই তৈরি করেছিল। ৩০ দিনের মধ্যে কমিশন গঠনের নিয়ম জানা থাকার পরও সরকার জেনে-বুঝে প্রতিষ্ঠানটিকে স্থবির করে রেখেছে।" তিনি আরও যোগ করেন, বর্তমান বিএনপি সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের ৩১ দফায় দুর্নীতিবিরোধী যে সুন্দর অঙ্গীকারের কথা বলা হয়েছিল, বাস্তবতার সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। সরকারের এই দীর্ঘ নীরবতা দুর্নীতিবাজদের কাছে ভুল বার্তা দিচ্ছে এবং মনে হচ্ছে দেশে দুর্নীতির এক ধরনের অলিখিত লাইসেন্স দেওয়া হচ্ছে। কেন এতদিনেও কমিশন গঠন করা সম্ভব হলো না, সে বিষয়ে সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ব্যাখ্যা আসা উচিত বলে তিনি মনে করেন।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.