
বিশেষ প্রতিবেদক, জাতিসংঘ: কক্সবাজার ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নেওয়া লাখ লাখ রোহিঙ্গা নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যেতে উন্মুখ হয়ে আছে। তবে দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু না হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। গতকাল শুক্রবার জাতিসংঘে মিয়ানমার বিষয়ক বিশেষ দূতের এক গুরুত্বপূর্ণ ব্রিফিংয়ে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসনের বিষয়টি জোরালোভাবে পুনর্ব্যক্ত করেছে বাংলাদেশ। বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পক্ষে কথা বলতে গিয়ে জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দীর্ঘায়িত এই মানবিক সংকট এখন বাংলাদেশের সামগ্রিক ব্যবস্থার ওপর এক বিশাল এবং অসহনীয় চাপ সৃষ্টি করেছে।
জাতিসংঘে দেওয়া বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী স্পষ্ট করে বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের মূল উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে। স্বভাবতই এর একটি স্থায়ী, বৈশ্বিক ও টেকসই সমাধান মিয়ানমারেই খুঁজে বের করতে হবে। অন্য কোনো উপায়ে এই সংকটের স্থায়ী নিরসন সম্ভব নয়।
বিপুল এই জনগোষ্ঠীর মানবিক দিক বিবেচনা করে বাংলাদেশ যে দীর্ঘ সময় ধরে উদারতা দেখিয়েছে, তা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, সম্পূর্ণ মানবিক কারণে বাংলাদেশ গত প্রায় এক দশক ধরে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে নিজের ভূখণ্ডে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তবে মানবিকতার এই বিশাল দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিয়ত নানামুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত এবং নিরাপত্তাজনিত চরম চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে বাস্তব চিত্র তুলে ধরে বলেন, এত বিপুলসংখ্যক শরণার্থীর দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতি স্থানীয় অধিবাসীদের জীবনযাত্রার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সেই সঙ্গে দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, স্থানীয় অর্থনীতি ও অবকাঠামোর ওপর সৃষ্টি করেছে নজিরবিহীন চাপ। এ কারণেই এই দীর্ঘস্থায়ী সংকটের একটি দ্রুত, নিরাপদ ও টেকসই সমাধান এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ শুরু থেকেই এই সংকটের একটি শান্তিপূর্ণ ও দ্বিপাক্ষিক সমাধানের পক্ষে কাজ করে আসছে। সেই প্রতিশ্রুতির কথা আবারও মনে করিয়ে দিয়ে রাষ্ট্রদূত সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের প্রতি তাদের কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করার আহ্বান জানান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, কেবল মৌখিক আশ্বাস নয়, বরং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমারের ভেতরে একটি অনুকূল ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক মহলকে অবিলম্বে কার্যকর ও দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে।
রোহিঙ্গাদের নিজেদের ইচ্ছার কথা উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন নোমান চৌধুরী জানান, বাস্তুচ্যুত এই মানুষেরা নিজেরাও আর শরণার্থী শিবিরে বন্দি জীবন কাটাতে চায় না; তারা সম্মান ও নিরাপত্তার সাথে মিয়ানমারে নিজেদের আদি ভিটাবাড়িতে ফিরে যেতে অত্যন্ত আগ্রহী। তাই এই সংকটের একমাত্র এবং চূড়ান্ত টেকসই সমাধান হচ্ছে তাদের মর্যাদাপূর্ণ স্বদেশ প্রত্যাবর্তন।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয় এই ব্রিফিংয়ে। রাষ্ট্রদূত বলেন, রাখাইন রাজ্যে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা না গেলে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে। আর এই পরিবেশ তৈরি করতে বিশ্বজুড়ে এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি সমন্বিত, সুনির্দিষ্ট ও জোরালো কূটনৈতিক উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশ আশা করে, বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও জাতিসংঘ এই সংকট সমাধানে অতীতের চেয়ে আরও বেশি সক্রিয় ভূমিকা পালন করবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.