
স্পোর্টস ডেস্ক: মাঠের লড়াইয়ে যখন পুরো বিশ্ব মেতেছে ফুটবল উন্মাদনায়, ঠিক তখনই বড় ধরনের আইনি ও মানসিক ধাক্কা খেল মরক্কো জাতীয় ফুটবল দল। দলের তারকা ডিফেন্ডার এবং ফরাসি ক্লাব প্যারিস সেন্ট জার্মেইর (পিএসজি) গুরুত্বপূর্ণ সদস্য আশরাফ হাকিমি ধর্ষণের অভিযোগে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচারের মুখোমুখি হতে যাচ্ছেন। ফরাসি সরকারি কৌঁসুলিরা ইতিমধ্যেই এই বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন, যা বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে মরক্কো শিবিরের জন্য এক বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই ঘটনার সূত্রপাত ২০২৩ সালে। সে সময় ২৪ বছর বয়সী এক তরুণী অভিযোগ তোলেন যে, প্যারিসে হাকিমির নিজস্ব বাসভবনে তিনি ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। অভিযোগের পর ২০২৩ সালের মার্চ মাস থেকে প্যারিসের পশ্চিম উপশহর নানতান্তের সরকারি প্রসিকিউটরের কার্যালয় এই ঘটনার প্রাথমিক তদন্ত শুরু করে। দীর্ঘ প্রায় তিন বছর ধরে চুলচেরা বিশ্লেষণের পর, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে একজন তদন্তকারী বিচারক মামলাটির আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর নির্দেশ দেন।
২৭ বছর বয়সী এই মরক্কো তারকা অবশ্য শুরু থেকেই তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। সম্প্রতি এই বিচারপ্রক্রিয়া বাতিল করার জন্য হাকিমির আইনজীবীদের পক্ষ থেকে একটি আপিল করা হয়েছিল। তবে ফরাসি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আদালত সেই আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন, যার ফলে হাকিমির বিচারের মুখোমুখি হওয়া এখন অবধারিত।
আইনি লড়াইয়ের এই চরম মুহূর্তেও মাঠের দায়িত্ব থেকে ছিটকে যাননি হাকিমি। বাংলাদেশ সময় ভোর চারটায় স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় ম্যাচে মরক্কোকে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। তবে মাঠে নামার ঠিক আগমুহূর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি আবেগঘন পোস্টের মাধ্যমে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করেছেন এই ডিফেন্ডার।
হাকিমি লিখেছেন, “বিচারব্যবস্থা যেন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলেছিল, ‘তুমি যদি বিখ্যাত না হতে, তবে এই মামলা কখনোই হতো না।’ আমি বছরের পর বছর চুপ থাকা বেছে নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম মর্যাদা ধরে রাখা, ধৈর্য ধরা এবং বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা রাখলে সঠিক সিদ্ধান্ত আসবে। আজ আমার পরিবার, আমার জীবন এবং সর্বোপরি সত্যের বিনিময়ে এমন এক গল্প ছড়ানো হচ্ছে, যা আমার নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, তারকা খ্যাতির কারণে তিনি সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন এবং প্রথম দিন থেকেই তিনি আদালতের মুখোমুখি হয়ে নিজের সত্য প্রকাশের অপেক্ষায় আছেন।
অন্য দিকে, অভিযোগকারী তরুণীর আইনজীবী র্যাচেল-ফ্লোর পার্দো আদালতের এই সিদ্ধান্তে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা আইনি লড়াইয়ের পর এই সিদ্ধান্ত আমার মক্কেলের মনে স্বস্তি ও আশা জাগিয়েছে।” তিনি অভিযোগ করেন যে, এতদিন হাকিমির আইনজীবীরা তাঁর মক্কেলের চরিত্রহননের চেষ্টা করেছেন। এই সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিচারব্যবস্থা নারীর পাশে দাঁড়িয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই মামলা পুরুষ ফুটবলের দুনিয়ায় যৌন সহিংসতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অস্বীকার ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি ভেঙে দিতে সাহায্য করবে। তবে আদালতে এই বিচারের সুনির্দিষ্ট তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি।
চলমান বিশ্বকাপে মরক্কোর গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে, যেখানে বর্তমানে পুরো দল অবস্থান করছে। তবে মরক্কো যদি নকআউট পর্বে উত্তীর্ণ হয় এবং তাদের ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে কানাডা বা মেক্সিকোতে পড়ে, তবে হাকিমির দলে থাকা নিয়ে বড় ধরনের আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
ঠিক একই ধরনের জটিলতায় গত সপ্তাহে পড়েছেন ঘানার ৩২ বছর বয়সী মিডফিল্ডার টমাস পার্টি। ২০২০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে চারজন নারীর আনা একাধিক যৌন নিপীড়নের অভিযোগে আগামী বছর তাঁর বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। এই অপরাধের সংশ্লিষ্টতার কারণে কানাডা সরকারের অফিশিয়াল নীতি অনুযায়ী তাঁকে দেশে প্রবেশাধিকার দেওয়া হয়নি, যার ফলে পানামার বিপক্ষে ঘানার উদ্বোধনী ম্যাচটি তিনি মিস করেন। হাকিমির ক্ষেত্রেও এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলে তা মরক্কোর বিশ্বকাপ যাত্রাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.