
ঢালিউডের আলোচিত চিত্রনায়িকা পরীমনি এবং ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) মো. গোলাম সাকলায়েনের অধ্যায় যেন কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। দীর্ঘ তদন্ত ও নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে এই পুলিশ কর্মকর্তাকে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই আদেশ নিশ্চিত করার পর থেকেই শোবিজ ও প্রশাসন—উভয় অঙ্গনেই শুরু হয়েছে নতুন করে তোলপাড়। একই সাথে আলোচনায় উঠে এসেছে ২০২৪ সালের জুন মাসে দেওয়া পরীমনির একটি বিস্ফোরক সাক্ষাৎকার, যেখানে তিনি সাকলায়েনকে ‘ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার’ বলে দাবি করেছিলেন।
গত বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগ থেকে জারি করা প্রজ্ঞাপনে স্পষ্ট উল্লেখ করা হয়, মো. গোলাম সাকলায়েন একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও চিত্রনায়িকা পরীমনির সাথে নৈতিকতাবহির্ভূত এবং শৃঙ্খলা পরিপন্থী ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। সাকলায়েনের সরকারি বাসভবন এবং বিভিন্ন স্থানে তাঁদের এই যাতায়াত ও সম্পর্কের বিষয়টি তদন্ত কমিটির মাধ্যমে সম্পূর্ণভাবে প্রমাণিত হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা অনুযায়ী সাকলায়েনকে সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় প্রশাসন। বর্তমানে তিনি ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
সাকলায়েনের চাকরি হারানোর এই খবরের পর সাধারণ মানুষের মন চলে গেছে ২০২৪ সালের ২৫ জুনের সেই দিনটিতে। সে সময় দেশের একটি প্রথম সারির জাতীয় গণমাধ্যমকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে পরীমনি সাকলায়েন প্রসঙ্গে অত্যন্ত খোলামেলা ও স্পষ্ট বক্তব্য দিয়েছিলেন। তখনো সাকলায়েনের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থার প্রক্রিয়া চলছিল। পরীমনি দৃঢ়তার সাথে বলেছিলেন, এই পুরো বিষয়টি সম্পর্কের কারণে নয়, বরং সাকলায়েনকে কোনো এক অদৃশ্য শক্তির ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার বানানো হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে পরীমনি প্রশ্ন তুলেছিলেন তাদের সম্পর্কের গভীরতা এবং জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে। তিনি বলেছিলেন, "সম্পর্কের বিষয় যদি আসে, এটা তো একজনের ব্যাপার না, দুজনের পক্ষ থেকেই আসে। এখন পর্যন্ত আমাদের সম্পর্কটা তো মানুষের কাছে পরিষ্কার নয়। আমরা প্রেমে ছিলাম, নাকি কী করছিলাম, কোনো কিছুই তো পরিষ্কার নয়।"
জনপ্রিয় এই অভিনেত্রী সে সময় আক্ষেপ করে জানান, সংবাদমাধ্যম বা প্রশাসন—কেউই তাঁদের আসল সম্পর্কের গভীরতা জানতে সরাসরি তাঁর বা সাকলায়েনের মুখোমুখি হয়নি। চারপাশে শুধু মনগড়া গল্প সাজানো হয়েছে। জনগণ ও মিডিয়া তাঁদের সম্পর্কটিকে সংজ্ঞায়িত করার আগেই অপবাদের তকমা লেপ্টে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
সাকলায়েনের পেশাগত দক্ষতার প্রশংসা করে পরীমনি বলেছিলেন, "নিঃসন্দেহে সাকলায়েন একজন ট্যালেন্ট ও সফল মানুষ। ওর পেছনেও অনেকে হয়তো লেগেছিল। তার চাকরি হারানো বা বরখাস্ত হওয়ার ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত এবং অন্যায়। সাকলায়েনের প্রতি নিঃসন্দেহে অন্যায় হয়েছে।"
কাদের বা কার ব্যক্তিগত আক্রোশের কারণে একজন মেধাবী পুলিশ কর্মকর্তার ক্যারিয়ার এভাবে থমকে গেল, এমন প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব পরীমনি দিতে না পারলেও, তিনি এটি বিশ্বাস করতে নারাজ যে সাকলায়েনের বিদায় শুধু ‘প্রেম-ভালোবাসার’ কারণে হয়েছে। তাঁর মতে, ভালোবাসা বা সম্পর্কের বিষয়টিকে একটি অদ্ভুত অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো হয়েছে, যার আড়ালে লুকিয়ে আছে অন্য কোনো উদ্দেশ্য।
উল্লেখ্য, ২০২১ সালে বোট ক্লাব কাণ্ডের পর পরীমনি ও ডিবির তৎকালীন এডিসি সাকলায়েনের সম্পর্কের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। সাকলায়েনের সরকারি বাসভবনে পরীমনির যাতায়াতের সিসিটিভি ফুটেজ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয়। এর পরপরই সাকলায়েনকে ডিবি থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল এবং শুরু হয়েছিল বিভাগীয় তদন্ত। ২০২৬ সালে এসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এই প্রজ্ঞাপন যেন সেই বহুল আলোচিত বিতর্কের ওপর একপ্রকার আইনি সিলমোহর দিল। তবে সাকলায়েনের এই পরিণতি এবং পরীমনির পুরোনো দাবির সমীকরণ সাধারণ মানুষের মনে নতুন করে অনেকগুলো প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.