
জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে এক নজিরবিহীন ও চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির জন্ম দিয়েছেন নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য এবং জামায়াতে ইসলামীর নেতা আব্দুল মুনতাকিম। সংসদে দেওয়া ভাষণে তিনি নিজের জীবিত বাবাকে 'মুক্তিযুদ্ধে শহীদ' বলে দাবি করেন। এই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা ও ট্রোলের মুখে পড়েছেন এই আইনপ্রণেতা। তীব্র বিতর্কের মুখে অবশেষে নিজের ভুল স্বীকার করে বক্তব্য সংশোধনের জন্য স্পিকার বরাবর লিখিত আবেদন জানিয়েছেন তিনি।
গত ১৪ জুন জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে বক্তব্য রাখছিলেন নীলফামারী-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম। নিজের বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি দাবি করেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পরিবারের বিশাল ও গৌরবোজ্জ্বল অবদান রয়েছে। সংসদীয় কার্যবিবরণী অনুযায়ী তিনি বলেন, "আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা-চাচা) সাত ভাই, চারজন মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন, ১১ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাই যোদ্ধা।"
সংসদে জামায়াত এমপির এই আবেগঘন ও নাটকীয় বক্তব্যের ভিডিও ক্লিপটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হতে খুব বেশি সময় নেয়নি। ভিডিওটি প্রকাশ্যে আসতেই নেটিজেনরা তাঁর তথ্যের সত্যতা এবং বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন। অনেকেই তাঁর নির্বাচনী হলফনামা ঘেঁটে বের করেন আসল তথ্য।
হলফনামা অনুযায়ী, সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিমের জন্ম তারিখ ১০ জানুয়ারি ১৯৮১ সাল। এই হিসাব ধরে ফেসবুকে নুর ইবনে আলম নামের একজন ব্যবহারকারী মন্তব্য করেন, "মুক্তিযুদ্ধে বাবা-দাদা শহীদ হওয়ার পরও তাঁর জন্ম ১৯৮১ সালে হয় কীভাবে? এটা তো বিজ্ঞান ও প্রকৃতির নিয়মকেই হার মানায়!" অন্য একজন নেটিজেন অনামিকা আমিন ব্যঙ্গাত্মক সুরে লেখেন, "উনি হয়তো বুঝতে পেরেছেন যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান হওয়া অত্যন্ত গর্বের বিষয়। তাই আবেগে একটু মিছা কথা মুখ দিয়ে বের হয়ে গেছে।" এমন হাজারো মন্তব্যে ফেসবুক, এক্স (সাবেক টুইটার) সহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে রীতিমতো ট্রোলের শিকার হচ্ছেন এই সংসদ সদস্য।
সংসদ সদস্যের দেওয়া এই বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নের ধলাগাছ গ্রামে আব্দুল মুনতাকিমের গ্রামের বাড়িতে যোগাযোগ করা হলে এক নাটকীয় সত্য বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, এমপি মুনতাকিমের বাবা মো. আব্দুল কাদের সৈয়দী এবং তাঁর মা—উভয়েই বর্তমানে জীবিত ও সুস্থ আছেন।
ছেলের এমন বক্তব্য নিয়ে জানতে চাওয়া হলে বাবা আব্দুল কাদের সৈয়দী প্রথম আলোকে বলেন, "আমার ছেলে একজন ভালো মানুষ। সে বিপুল ভোটে এলাকার মানুষের ভালোবাসায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। তার ভালো কাজের জন্য আপনারা সবাই দোয়া করবেন।" তবে ছেলের এই বিভ্রান্তিকর বক্তব্য নিয়ে তিনি সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
রাজনৈতিকভাবে এই বিব্রতকর পরিস্থিতি সামাল দিতে একে অসাবধানতাবশত ভুল বা 'মুখের ফসকে যাওয়া কথা' বলে দাবি করছেন তাঁর রাজনৈতিক সহকর্মীরা। উল্লেখ্য, সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার আগে আব্দুল মুনতাকিম সৈয়দপুর উপজেলা জামায়াতের আমির এবং স্থানীয় আল-ফারুক একাডেমি নামের একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ছিলেন।
ওই প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক এবং উপজেলা জামায়াতের নায়েবে আমির শফিকুল ইসলাম এই বিষয়ে বলেন, "সংসদে দেওয়া বক্তব্যটি এমপি মহোদয়ের একটি অনাকাঙ্ক্ষিত 'স্লিপ অব টাং' বা মুখের ভুল ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষ মাত্রই ভুল হতে পারে, তাই বিষয়টি সবার ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখাই ভালো।"
চতুর্মুখী সমালোচনা ও দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কায় অবশেষে মুখ খুলেছেন সংসদ সদস্য আব্দুল মুনতাকিম নিজেই। মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি স্বীকার করেন যে সংসদে দেওয়া তাঁর বক্তব্যটি পুরোপুরি সঠিক ছিল না।
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, "সংসদে দেওয়া বক্তব্যটি সম্পূর্ণ সঠিক ছিল না। মূলত আমার দাদার ভাই মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন। আমি আমার এই অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য অনুতপ্ত।" তিনি আরও জানান, ভুল বুঝতে পারার পর সংসদীয় কার্যপ্রণালী বিধি অনুযায়ী গত ১৭ জুন (বুধবার) স্পিকার বরাবর একটি লিখিত চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে তিনি সংসদের অফিশিয়াল প্রসিডিং বা কার্যবিবরণী থেকে তাঁর বক্তব্যের ওই ভুল অংশটুকু সংশোধন বা এক্সপাঞ্জ করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন।
পাশাপাশি তিনি বলেন, "বিষয়টি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে সাংবাদিকদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে আমি আমার বক্তব্যের সঠিক ব্যাখ্যা তুলে ধরব। এর জন্য শিগগিরই একটি সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হচ্ছে। আপাতত এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাচ্ছি না।"
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সংসদের মতো একটি পবিত্র ও দায়িত্বশীল জায়গায় দাঁড়িয়ে নিজের পরিবারের ইতিহাস এবং মহান মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া কোনোভাবেই কাম্য নয়। এটি কেবল সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তিকেই ক্ষুণ্ন করেনি, বরং সংসদীয় রীতিনীতিকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.