
দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ও আলোচিত আর্থিক কেলেঙ্কারি ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরি’ মামলার তদন্তে এক দশক পর বড় অগ্রগতি হয়েছে। দীর্ঘ ১১ বছরেরও বেশি সময় ধরে পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পর অবশেষে মামলার খসড়া অভিযোগপত্র (চার্জশিট) প্রস্তুত করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। প্রায় দেড়শ পৃষ্ঠার এই খসড়া অভিযোগপত্রটি সম্প্রতি চূড়ান্ত আইনি পরামর্শের জন্য অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয়ে হস্তান্তর করেছেন মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা।
সিআইডি ও সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, এই বিশাল আর্থিক জালিয়াতির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমানসহ দেশের ১০ জন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও বিশিষ্ট ব্যক্তির নাম খসড়া চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সবমিলিয়ে বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, উত্তর কোরিয়া ও চীনের নাগরিকসহ দেশি-বিদেশি মোট ৬৪ জন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এই চুরির ঘটনায় সরাসরি দায়ী করা হয়েছে। এত বড় কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে তৎকালীন গভর্নর ড. আতিউর রহমানের বিরুদ্ধে, যিনি বর্তমানে পলাতক রয়েছেন।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকে থাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট থেকে ১০১ মিলিয়ন ডলার চুরির এই ঘটনায় সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার আল মামুন গত বছরের ডিসেম্বর থেকে তদন্তভার পরিচালনা করছেন। তিনি জানান, অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে আইনি দিকনির্দেশনা ও পরামর্শ পেলেই আদালতে চূড়ান্ত চার্জশিট দাখিল করা হবে।
খসড়া চার্জশিট অনুযায়ী, অভিযুক্ত ১০ বাংলাদেশির মধ্যে ড. আতিউর রহমান ছাড়াও রয়েছেন—বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম, সাবেক নির্বাহী পরিচালক শুভঙ্কর সাহা, সাবেক নির্বাহী পরিচালক মেজবাউল হক, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস এ খান, সাবেক মহাব্যবস্থাপক এ এফ এম আসাদুজ্জামান এবং উপপরিচালক জোবায়ের বিন হুদা। এছাড়া কে এম আব্দুল ওয়াদুদ, রেজাউল করিম ও মো. সুলতান মাসুদ আহমেদ নামে আরও তিন বাংলাদেশির নাম রয়েছে, যাদের পূর্ণাঙ্গ পরিচয় উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
তদন্তে উঠে এসেছে, এই আন্তর্জাতিক জালিয়াতি চক্রের মূল হোতা ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের তৎকালীন আইটি উপদেষ্টা ও ভারতীয় নাগরিক রাকেশ আস্তানা। চুরির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পর রহস্যজনকভাবে তাকে প্রধান করেই একটি ফরেনসিক অডিট কমিটি গঠন করা হয়েছিল। অভিযোগ রয়েছে, ওই অডিটের আড়ালে ডিজিটাল আলামত মুছে ফেলার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। রাকেশ আস্তানা ছাড়াও ভারতীয় নাগরিক প্রীতম রেড্ডি, সুধীন্দ্রআথ্রেশ, নীলভান্নান ও মাদুক্কুর আনন্দনের বিরুদ্ধে হ্যাকিং ও মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগ আনা হয়েছে।
খসড়া চার্জশিটে উত্তর কোরিয়ার কুখ্যাত হ্যাকার দল ‘ল্যাজারাস গ্রুপ’ এবং পার্ক জিন হিয়োকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। চীনা নাগরিকদের মধ্যে গাও শুহুয়াসহ দুই জন এবং জাপানের সাসাকি নামের এক ব্যক্তিকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া চুরির অর্থের একটি অংশ শ্রীলঙ্কায় ডাইভার্ট করার দায়ে দেশটির হেগোডা গামাগে শ্যালিকা পেরেরাসহ ৮টি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এবং ফিলিপাইনের সোলেয়ার রিসোর্ট অ্যান্ড ক্যাসিনো ও কাম সিন অংসহ ৩৬টি প্রতিষ্ঠানকে অভিযুক্ত করা হয়েছে।
এই মামলার সাবেক তদন্ত কর্মকর্তা এবং পুলিশ সদর দপ্তরের বর্তমান অতিরিক্ত ডিআইজি রায়হান উদ্দিন খান (যিনি ২০১৬ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত তদন্ত করেছেন) এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ করেছেন। তিনি জানান, ২০২৩ সালের এপ্রিল মাসের মধ্যে ফিলিপাইন, ভারত ও জাপান থেকে পারস্পরিক আইনি সহায়তা চুক্তির (এমএলএআর) মাধ্যমে সাড়ে ৪ হাজার পৃষ্ঠার তথ্য-প্রমাণ ও সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবের রিপোর্ট সংগ্রহের পর ৭০ জনের সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়।
তবে ২০২০ সালে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের উপস্থিতিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে তদন্ত কর্মকর্তাদের ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করা হয়। বাংলাদেশিদের নাম বাদ দিয়ে শুধু বিদেশিদের অভিযুক্ত করে চার্জশিট দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এতে অস্বীকৃতি জানালে রায়হান উদ্দিন খান এবং তৎকালীন বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তফা কামালকে বৈঠক থেকে বের করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ২০২২ ও ২০২৩ সালেও সিআইডির তৎকালীন শীর্ষ কর্মকর্তারা একই চাপ দেন এবং জেনেশুনে আপস না করায় রায়হান উদ্দিন খানকে সিআইডি থেকে জয়পুরহাটে বদলি করে তদন্ত ভিন্ন খাতে নেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়।
পরবর্তীতে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর গত বছরের ১১ মার্চ সাবেক আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলকে প্রধান করে ৬ সদস্যের একটি বিশেষ পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। এই কমিটির সুনিপুণ তত্ত্বাবধানে এবং কঠোর গোপনীয়তায় সিআইডি নতুন করে স্বাধীনভাবে তদন্ত সম্পন্ন করে।
পর্যালোচনা কমিটির অন্যতম সদস্য ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব গণমাধ্যমকে বলেন, “আমরা দায়িত্ব নিয়ে দেখতে পাই যে প্রথম তদন্ত কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে সঠিক ট্র্যাকে তদন্ত করছিলেন, কিন্তু তাকে রাজনৈতিকভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছিল। আমরা সমস্ত বাধা দূর করে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করে খসড়া চার্জশিট প্রস্তুত নিশ্চিত করেছি। বর্তমান সরকার এই কেলেঙ্কারির সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।”
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের সেই সাইবার ডাকাতির ঘটনায় ১০১ মিলিয়ন ডলারের মধ্যে এ পর্যন্ত মাত্র ৩৪.৬ মিলিয়ন ডলার উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। বাকি ৬৬.৪ মিলিয়ন ডলার এখনো অপসারিত রয়েছে, যা উদ্ধারে আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া চলমান।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.