
চট্টগ্রাম ব্যুরো:
সাড়ে তিন বছর আগে চট্টগ্রাম মহানগরীতে সংঘটিত দেশ কাঁপানো ও বহুল আলোচিত ৫ বছর বয়সী শিশু আলিনা ইসলাম আয়াত অপহরণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের রায় ঘোষিত হয়েছে। আদালত এই নৃশংস ঘটনার মূল হোতা এবং ওই পরিবারের তৎকালীন ভাড়াটে মো. আবিরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের চূড়ান্ত আদেশ দিয়েছেন।
আজ বুধবার (১৭ জুন, ২০২৬) বেলা একটার দিকে ষষ্ঠ অতিরিক্ত চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ মুহাম্মদ আলী আক্কাস জনাকীর্ণ আদালতে এই ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। রায় ঘোষণার সময় কাঠগড়ায় আসামি আবির উপস্থিত ছিলেন এবং পরে কড়া নিরাপত্তায় তাকে কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয়।
রায় ঘোষণার সময় বিজ্ঞ আদালত ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেন। আদালত বলেন, এই হত্যাকাণ্ডটি কোনো সাধারণ অপরাধ নয়; এটি ছিল সম্পূর্ণ পূর্বপরিকল্পিত, অত্যন্ত নিষ্ঠুর, নৃশংস এবং সমাজে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টিকারী। নিষ্পাপ একটি শিশুকে যেভাবে হত্যা করে লাশ গুমের চেষ্টা করা হয়েছে, তা সভ্য সমাজকে স্তব্ধ করে দেয়।
রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) জালাল উদ্দিন রায়ের তথ্য নিশ্চিত করে গণমাধ্যমকে জানান, আদালত দণ্ডবিধির ৩০২ ধারায় আসামিকে হত্যার অপরাধে ফাঁসির আদেশ দেওয়ার পাশাপাশি ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করেছেন। অনাদায়ে তাকে আরও তিন মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। আদালত নির্দেশ দিয়েছেন যে, জরিমানার এই অর্থ ভুক্তভোগী শিশু আয়াতের পরিবারকে প্রদান করা হবে। একই সঙ্গে, দণ্ডবিধির ২০১ ধারায় তথ্যপ্রমাণ লোপাট ও লাশ গুম করার অপরাধে আসামিকে আরও ৫ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।
আদালত ও পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১৫ নভেম্বর চট্টগ্রাম নগরের ইপিজেড থানার বন্দরটিলা এলাকার বাসিন্দা সোহেল রানার ৫ বছর বয়সী কন্যাসন্তান আলিনা ইসলাম আয়াত নিখোঁজ হয়। নিখোঁজের পর পরিবারের পক্ষ থেকে ইপিজেড থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। তবে স্থানীয় পুলিশের পাশাপাশি ঘটনার ভয়াবহতা আঁচ করে পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) ছায়া তদন্ত শুরু করে।
পিবিআইয়ের আধুনিক ও তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর তদন্তে বেরিয়ে আসে এক ভয়ঙ্কর সত্য। জানা যায়, আয়াতের বাবার বাড়ির দীর্ঘদিনের ভাড়াটে মো. আবিরই এই অপহরণের মূল পরিকল্পনাকারী। ২৫ নভেম্বর আবিরকে গ্রেপ্তার করা হলে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে এবং পরবর্তীতে আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে সে নিজের অপরাধের কথা অকপটে স্বীকার করে।
তদন্তকারী সংস্থা জানায়, মূলত মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায়ের উদ্দেশ্যেই শিশু আয়াতকে অপহরণ করেছিল আবির। কিন্তু একপর্যায়ে তার মূল পরিকল্পনা ভেস্তে যাওয়ার আশঙ্কায় সে শিশুটিকে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হয়নি এই পাষণ্ড, নিজের অপরাধ ঢাকতে শিশুটির মরদেহ ধারালো অস্ত্র দিয়ে ছয় টুকরো করে বস্তাবন্দী করে। পরবর্তীতে সেই টুকরোগুলো সাগরের পাড়ে এবং সংলগ্ন স্লুইসগেটের খালের পাশে ফেলে দেওয়া হয়।
২০২৩ সালের ১০ অক্টোবর পিবিআইয়ের তৎকালীন পরিদর্শক মুস্তাফিজুর রহমান আদালতে এই মামলার পুঙ্খানুপুঙ্খ অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দেন। অভিযোগপত্রে মো. আবির এবং তার ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর বন্ধুকে অভিযুক্ত করা হয়। বর্তমানে প্রাপ্তবয়স্ক আবিরের রায় ঘোষণা হলেও, ওই কিশোরের বিচার প্রক্রিয়া শিশু আদালতে চলমান রয়েছে।
আজ সকাল থেকেই আয়াত হত্যা মামলার রায়কে কেন্দ্র করে চট্টগ্রাম আদালত ভবনের দ্বিতীয় তলায় গণমাধ্যমকর্মী এবং আয়াতের স্বজনদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায়। আয়াতের পরিবার ও প্রতিবেশীরা সকাল থেকেই ব্যানার-ফেস্টুন হাতে আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান নেন এবং খুনি আবিরের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে স্লোগান দিতে থাকেন। রায় ঘোষণার পর এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
আদালতের রায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে আয়াতের বাবা সোহেল রানা গণমাধ্যমকে বলেন, "আমরা এই রায়ে অত্যন্ত খুশি এবং আদালতের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে আমাদের একমাত্র দাবি—আসামির এই ফাঁসির আদেশ যেন খুব দ্রুত কার্যকর করা হয়। এই ধরনের অপরাধীদের শাস্তি দ্রুত কার্যকর না হলে সমাজে অন্য অপরাধীরা উৎসাহিত হবে। আমরা চাই আর কোনো বাবার বুক যেন এভাবে খালি না হয়।"
আইনজীবীরা মনে করছেন, এই রায়ের মাধ্যমে সমাজে একটি শক্ত বার্তা যাবে যে, শিশুদের ওপর হওয়া যেকোনো ধরণের নৃশংসতার বিচার এই দেশে নিশ্চিত এবং তা অত্যন্ত কঠোর।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.