সাম্প্রতিক সময়ে দেশে নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। ঘরে কিংবা বাইরে—কোথাও আজ নারীরা নিজেদের নিরাপদ বোধ করছেন না। চার বছরের শিশু থেকে শুরু করে বিবাহিত নারী, কেউই এই ঘৃণ্য অপরাধ থেকে রেহাই পাচ্ছে না। গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একের পর এক গণধর্ষণের খবর বিবেকবান মানুষকে স্তম্ভিত করে তুলছে। এই পরিস্থিতির বিরুদ্ধে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে প্রতিবাদকারীরা রাস্তায় নেমেছেন, যা জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, ধর্ষণ কেবল একটি আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর সামাজিক ব্যাধি, ক্ষমতার দম্ভ এবং পুরুষতান্ত্রিক বা পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা।
ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, তীব্র সামাজিক আন্দোলনের মাধ্যমে বড় বড় অপরাধের গ্রাফ নামিয়ে আনা সম্ভব। যেমন, আজ থেকে দুই দশক আগে দেশে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ জন নারী অ্যাসিড সন্ত্রাসের শিকার হতেন। কিন্তু সর্বস্তরের মানুষের সচেতনতা, কঠোর আইন এবং সামাজিক প্রতিরোধের কারণে ২০১৯ সালে এই সংখ্যা মাত্র ১৮-তে নেমে আসে। ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধের বিরুদ্ধেও যদি একইভাবে দেশজুড়ে তীব্র সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায়, তবে এই ব্যাধি থেকেও সমাজকে মুক্ত করা সম্ভব। রাষ্ট্রকে অপরাধীদের দ্রুততম সময়ে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর হয়।
[caption id="attachment_1936" align="aligncenter" width="1152"] শিশু ও নারী নির্যাতন, নিপীড়ন ও ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে নীলফামারীতে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সভা ছবি: প্রথম আলো[/caption]
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, ধর্ষণের মূল চালিকাশক্তি কেবল যৌন লালসা বা কামনা নয়। এটি মূলত দুর্বলকে দাবিয়ে রাখা, নিয়ন্ত্রণ করা এবং নিজের ক্ষমতা জাহির করার একটি জঘন্য মাধ্যম। যুক্তরাষ্ট্রের এক জরিপে দেখা গেছে, বহু নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে এই ট্রমার মধ্য দিয়ে যান, যার ফলে তারা পরবর্তীতে 'পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার' বা তীব্র মানসিক বিষাদে ভোগেন।
আমাদের সমাজে একটি প্রচলিত ভুল ধারণা বা কুসংস্কার রয়েছে যে, নারীর পোশাকের কারণে ধর্ষণ বাড়ে। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। পোশাকের কোনো সম্পর্ক এখানে নেই; সম্পূর্ণ শরীর ঢেকে রাখা নারী এবং কোলের শিশুও এই লালসার শিকার হচ্ছে। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক সংস্থা 'রেপ ক্রাইসিস'-এর তথ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীরা পরিচিত বা আপনজনদের দ্বারাই বেশি নির্যাতিত হন। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, প্রায় ৭৭ শতাংশ নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটে পরিবারের চার দেয়ালের ভেতরে। একইভাবে শিশুদের ওপর হওয়া যৌন নির্যাতনের বড় অংশই ঘটে পরিচিত পরিবেশ ও আত্মীয়স্বজনের মাধ্যমে।
জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা (ইউএন উইমেন) বিশ্বজুড়ে নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে শক্তিশালী রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নারী-পুরুষের সমতা নিশ্চিতকারী আইনের সঠিক বাস্তবায়ন, নারী সংগঠনগুলোতে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং দৈনন্দিন জীবনের বৈষম্যগুলো দূর করা।
তবে সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসতে হবে পরিবার থেকে। যেহেতু এই অপরাধগুলো পুরুষদের দ্বারা সংঘটিত হয়, তাই পুরুষদের মানসিকতা এবং দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা জরুরি। একটি ছেলে শিশুকে ছোটবেলা থেকেই শেখাতে হবে কীভাবে নারীকে সম্মান করতে হয়। পরিবারের বড় পুরুষরা যদি ঘরের নারীদের সঙ্গে সহিংস আচরণ করেন, তবে শিশুরা সেটাই শেখে। ছেলেদের শুধু ‘হ্যাঁ’ শোনার অভ্যাসের বাইরে গিয়ে ‘না’ শব্দটিকে সম্মান করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সচেতনতামূলক ক্যাম্পেইনে পুরুষদের জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। যেমন—নিজের পুরুষত্বকে অহংকার বা আগ্রাসনের প্রতীক না বানিয়ে মানবিক হিসেবে গড়ে তোলা, সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর সম্মতিকে সর্বোচ্চ মূল্য দেওয়া, সামাজিক মাধ্যমে বা বাস্তবে নারীকে হেয় করে এমন কৌতুকের প্রতিবাদ করা এবং নারীর মর্যাদা রক্ষার আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়া।
আমাদের দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ক্ষমতার অপব্যবহার অনেক সময় অপরাধীদের পার পাওয়ার সুযোগ করে দেয়। এই অচলাবস্থা ভাঙতে হলে প্রতিবাদ কেবল ফেসবুকের স্ট্যাটাসে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। ঘর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও রাজপথ—সব জায়গায় এই পিতৃতান্ত্রিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। সম্মিলিত ও প্রবল প্রতিবাদের মাধ্যমেই একদিন সমাজ থেকে এই অন্ধকারের অবসান ঘটবে এবং নারী ও শিশুর জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবী গড়ে উঠবে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.