দেশের ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার লাগামহীন ব্যয়ের প্রেক্ষাপটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের স্বস্তির বার্তা নিয়ে আসছে নতুন জাতীয় পে-স্কেল। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১ জুলাই থেকে বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে-স্কেলের প্রথম ধাপ কার্যকর করার জোর প্রস্তুতি চলছে। এই ধাপে সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতনের সঙ্গে অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ অর্থ যুক্ত হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে বর্তমান ও সাবেক তথা পেনশনভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও বড় ধরনের আর্থিক সুবিধার ঘোষণা আসতে পারে।
সংশ্লিষ্ট অর্থ বিভাগ ও নীতিগত পর্যায় থেকে জানা গেছে, দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, রাজস্ব আদায়ের গতি এবং বৈশ্বিক আর্থিক মন্দার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একবারে নয়, বরং ধাপে ধাপে এই নতুন পে-স্কেল কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দিন অর্থাৎ ১ জুলাই ২০২৬ থেকে নতুন কাঠামোর প্রথম ধাপের কার্যক্রম শুরু হবে।
[caption id="attachment_1693" align="aligncenter" width="1076"]
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ছবি: বাসস[/caption]
পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম বছর সরকারি কর্মচারীরা তাদের বর্তমান মূল বেতনের ওপর ৫০ শতাংশ সমন্বিত সুবিধা পাবেন। এর পরবর্তী অর্থবছরে (দ্বিতীয় ধাপে) আরও ৫০ শতাংশ সমন্বিত বেতন যুক্ত হবে। অর্থাৎ দুই বছরের মধ্যে মূল বেতনের শতভাগ সমন্বয় সম্পন্ন করার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে সরকারের আর্থিক চাপ সামলাতে বাড়িভাড়া, চিকিৎসা, যাতায়াত, বিশেষ প্রণোদনা কিংবা ঝুঁকি ভাতার মতো অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাগুলো তৃতীয় বছর তথা ২০২৮-২৯ অর্থবছরে গিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আসন্ন জাতীয় বাজেটে নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের প্রাথমিক ধাপের জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ বরাদ্দ রাখার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির নেতৃত্বাধীন পুনর্গঠিত কমিটি এই সংক্রান্ত চূড়ান্ত সুপারিশমালা প্রস্তুত করছে। কমিটির বৈঠক শেষে এই রূপরেখা দ্রুতই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে। সরকারপ্রধানের সবুজ সংকেত পাওয়ার পরপরই অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে এই সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক প্রজ্ঞাপন বা গ্যাজেট জারি করা হবে।
কমিটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের সূত্রে জানা গেছে, এই পে-স্কেলের সুবিধা শুধু নির্দিষ্ট কোনো ক্যাডারের জন্য নয়, বরং প্রশাসন, শিক্ষক, পুলিশ, স্বাস্থ্যকর্মী, বিচার বিভাগ ও মাঠ প্রশাসনসহ সকল সরকারি কর্মচারীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। এমনকি স্বায়ত্তশাসিত ও আধা-স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্যও সমন্বিত নির্দেশনা জারি করা হতে পারে।
এবারের পে-স্কেলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, নিম্ন ও মধ্যম স্তরের কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির হারে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। বাজারমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই শ্রেণির মানুষরাই সবচেয়ে বেশি হিমশিম খাচ্ছেন। তাই বিভিন্ন গ্রেডের মধ্যে বিদ্যমান আর্থিক বৈষম্য কমিয়ে এনে নিম্নস্তরের কর্মীদের সর্বোচ্চ সুবিধা দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
চাকরিজীবীদের পাশাপাশি যারা অবসরে গিয়েছেন, সেই পেনশনভোগীদের জন্যও থাকছে বড় চমক। সাবেক সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন বেতন কমিশনের দেওয়া সুপারিশ অনুযায়ী, পেনশন বৃদ্ধির হার এবার নজিরবিহীন হতে পারে।
সুপারিশের খসড়া অনুযায়ী, যারা বর্তমানে প্রতি মাসে ২০ হাজার টাকার কম পেনশন পান, তাদের পেনশনের পরিমাণ প্রায় ১০০ শতাংশ বা দ্বিগুণ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। এছাড়া ২০ থেকে ৪০ হাজার টাকা মাসিক পেনশনপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে ৭৫ শতাংশ এবং যারা ৪০ হাজার টাকার বেশি পেনশন পান, তাদের ক্ষেত্রে ৫৫ শতাংশ পর্যন্ত পেনশন বৃদ্ধির সুপারিশ বিবেচনা করা হচ্ছে। আসন্ন বাজেটে এর কতটুকু অংশ কার্যকর করা সম্ভব, তা নিয়ে এখন চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।
সরকারি চাকরিজীবীদের কয়েক ধাপে বেতন বৃদ্ধির এই কৌশলকে ইতিবাচক ও সময়োপযোগী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ এই বিষয়ে জানান, গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয় যেভাবে বেড়েছে, সেই তুলনায় সরকারি কর্মচারীদের নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট বা আয় বাড়েনি। ফলে সাধারণ নিত্যপণ্য কিনতেই তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ বিবেচনায় নিয়ে একবারে সব ভাতা না বাড়িয়ে ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানোর এই সিদ্ধান্তটি সরকারের সামর্থ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
একই সুর শোনা গেছে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজের কণ্ঠেও। তিনি বলেন, বর্তমান উচ্চ মূল্যস্ফীতির বাজারে সরকারি কর্মচারীদের সুরক্ষায় নবম পে-স্কেলের সিদ্ধান্ত যৌক্তিক। তবে সরকারের ওপর যেন হঠাৎ বড় অর্থনৈতিক চাপ তৈরি না হয়, সেজন্য তিন ধাপে এটি বাস্তবায়নের কৌশল অত্যন্ত দূরদর্শী ও বুদ্ধিদীপ্ত সিদ্ধান্ত।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.