
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসের সার্বিক চিত্রে এক বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। বিগত সরকারের পতনের পর হলের ভেতর দীর্ঘদিনের চেনা নিপীড়নমূলক ‘গণরুম’ এবং ‘গেস্টরুম’ সংস্কৃতির অবসান ঘটেছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের জোর করে কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মসূচিতে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা এখন পুরোপুরি বন্ধ। হলের ক্যানটিনগুলোর খাবারের মান আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে এবং আসন বণ্টনও এখন দলীয় প্রভাবে নয়, বরং মেধা ও স্থায়ী ঠিকানার ভিত্তিতে করছে হল প্রশাসন। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের সমান্তরালেই ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে এক নতুন ভয়ের সংস্কৃতি—যা ‘ট্যাগিং’, মব আতঙ্ক ও নীতি পুলিশিং নামে পরিচিতি পাচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি আবাসিক হলে (১৩টি ছাত্রদের, ৫টি ছাত্রীদের) অতীতে আসন বণ্টন থেকে শুরু করে ডাইনিং-ক্যানটিন পর্যন্ত সবকিছুই ছিল ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের নিয়ন্ত্রণে। তাদের ইশারায় প্রথম বর্ষের নবীন শিক্ষার্থীদের গাদাগাদি করে থাকতে হতো অমানবিক গণরুমে। গেস্টরুমে ডেকে নিয়ে চলত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। বর্তমানে সেই চিত্র অতীত। মাস্টারদা সূর্য সেন হলের এক সময়ের কুখ্যাত ‘লাদেন গুহা’ নামে পরিচিত গণরুমটি এখন সাধারণ শিক্ষার্থীদের খেলার ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। জহুরুল হক হলের টিনশেড ও বর্ধিত ভবনের গণরুমগুলোতেও এখন সীমিত ও স্বস্তিদায়ক আবাসন নিশ্চিত করা হয়েছে। অছাত্র বা বহিরাগতরা হল ছাড়ায় আবাসন সংকট অনেকটাই কমে এসেছে। এছাড়া ক্যাম্পাসের সাংস্কৃতিক অঙ্গনেও এসেছে রূপান্তর; কনসার্টের চেয়ে এখন কাওয়ালি, সিরাত সন্ধ্যা ও পুঁথিপাঠের মতো আয়োজনের আধিক্য দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসাকেন্দ্রের পরিবেশ ও সেবার মানও আগের চেয়ে উন্নত হয়েছে।
[caption id="attachment_1867" align="alignleft" width="622"]
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাজেয় বাংলা ফাইল ছবি[/caption]
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ছাত্রলীগ ক্যাম্পাসে নিষিদ্ধ ও একচ্ছত্র আধিপত্যহীন হয়ে পড়েছে। অতীতে যেখানে ইসলামী ছাত্রশিবির প্রকাশ্যে কোনো কার্যক্রম চালাতে পারত না, সেখানে এখন তারা প্রকাশ্যে রাজনীতি করছে। এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) এবং বেশিরভাগ হল সংসদের নির্বাচিত নেতৃত্বেও এখন শিবির-সমর্থিত প্যানেলের জয়জয়কার। ছাত্রদলের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখাও এখন ক্যাম্পাসে বেশ সক্রিয় এবং তারা অতীতে গেস্টরুমের নিপীড়নে জড়িতদের ‘আমলনামা’ প্রকাশ করে হলের দেয়ালে ব্যানার টাঙিয়েছে। পাশাপাশি বামপন্থী ছাত্রসংগঠন, ইসলামপন্থী দল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ছাত্রসংগঠন 'জাতীয় ছাত্রশক্তি' সমান্তরালভাবে তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
ক্যাম্পাসে সরাসরি রাজনৈতিক সংঘর্ষ ও মারামারি কমলেও, ‘মব আতঙ্ক’ শিক্ষার্থীদের মাঝে নতুন করে উদ্বেগ ছড়াচ্ছে। অতীতে যেমন ছাত্রলীগ ‘শিবির সন্দেহে’ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন চালাত, এখন ঠিক একইভাবে ‘ছাত্রলীগ’ বা ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ তকমা বা ট্যাগ দিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হেনস্তা ও মারধর করার অভিযোগ উঠছে।
এমনকি নির্বাচিত শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের একাংশের বিরুদ্ধেও এই মব কালচারের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এ বি জুবায়ের এবং সাহিত্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় মব তৈরিতে নেতৃত্ব দেওয়ার অভিযোগ এনেছে অন্যান্য ছাত্রসংগঠন ও শিক্ষক নেটওয়ার্ক। যদিও এই নেতারা দাবি করেছেন, এগুলো মব নয় বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিবাদ। তবে গত ৯ মার্চ ছাত্রলীগ করার অভিযোগে এক শিক্ষার্থীকে মারধর করা এবং পরবর্তীতে সাবেক এক হল ভিপি ও ছাত্রনেতাকে হেনস্তার ঘটনায় ছাত্রশক্তির একাংশের সংশ্লিষ্টতা ক্যাম্পাসকে বিতর্কিত করেছে। পরবর্তীতে আবার ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের হাতে এই ডাকসু নেতাদেরই মারধরের শিকার হতে হয়েছে।
মব সংস্কৃতির পাশাপাশি ক্যাম্পাসে ‘নীতি পুলিশিং’ বা নৈতিকতার নামে জোরজুলুমের ঘটনাও ঘটছে। হকার উচ্ছেদের নামে সাধারণ হকারদের মারধর এবং কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে বহিরাগত কিশোর-তরুণদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানোর মতো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্ক এক গোলটেবিল আলোচনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছে, ক্যাম্পাসে 'প্রেশার গ্রুপ' নাম দিয়ে এক নতুন ভয়ের সংস্কৃতি চালু করা হয়েছে, যেখানে শিক্ষকরাও হেনস্তার শিকার হচ্ছেন।
এদিকে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও প্রশাসনিক কাঠামোর দলবাজি বন্ধ হয়নি। বিগত সরকারের আমলে যেমন শুধু আওয়ামীপন্থী শিক্ষকরা পদ পেতেন, বর্তমান সরকারের সময়েও বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদে বসানো হচ্ছে। গত দুই বছর ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেটে উপাচার্য প্যানেল নির্বাচন এবং শিক্ষক সমিতির নির্বাচনও ঝুলে রয়েছে।
শ্রেণিকক্ষের তীব্র সংকট, বিশেষ করে কলাভবনের বিভিন্ন বিভাগে শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত ক্লাস করার জন্য কক্ষ খুঁজে বেড়াতে হয়। এছাড়া বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য ই-মেইল ভেরিফিকেশনে অতিরিক্ত ফি নেওয়া এবং দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ রয়ে গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানান, বর্তমান প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল সমস্যা সমাধানে আন্তরিক এবং ক্যাম্পাসে যেকোনো ধরণের মব তৈরির অপচেষ্টা রুখতে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.