ঐতিহাসিক জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কঠিন ও সংকটময় দিনগুলোতে দেশের মানুষ যখন অবরুদ্ধ ছিল, তখন প্রবাসে থাকা বাংলাদেশিরাই মুক্তির নতুন আশা জাগিয়ে রেখেছিলেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। গত বছরের সেই উত্তাল দিনগুলোতে বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে জনমত গঠন ও রাজপথে সক্রিয় থেকে প্রবাসীরা যে অসামান্য অবদান রেখেছেন, তার জন্য গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয় সময় রোববার (১৭ মে) দুপুর ১২টায় দক্ষিণ কোরিয়ার খিম্পু শহরের 'খিম্পু ফরেন সাপোর্ট সেন্টারে' আয়োজিত এক জমকালো নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। দক্ষিণ কোরিয়া সফররত আসিফ মাহমুদকে স্বাগত জানাতে এবং শুভেচ্ছা বিনিময় করতে এই বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে 'এনসিপি ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স, দক্ষিণ কোরিয়া'।
[caption id="attachment_1477" align="aligncenter" width="2560"] ছবি- অনলাইন থেকে সংগৃহীত[/caption]
দক্ষিণ কোরিয়ায় অবস্থানরত এনসিপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীসহ নানা শ্রেণি-পেশার প্রবাসী বাংলাদেশিদের উপস্থিতিতে মুখরিত ছিল এই সংবর্ধনা সভা। অনুষ্ঠানে আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া বলেন, "শুধু বিগত গণঅভ্যুত্থানেই নয়, বরং সামনের দিনগুলোতেও দেশের জন্য প্রবাসীদের ভূমিকা সমান গুরুত্বপূর্ণ। 'জুলাই সনদ' এবং জনগণের দীর্ঘদিনের লালিত 'গণভোটের আকাঙ্ক্ষা' বাস্তবায়নে প্রবাসীদের অতীতের মতোই ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।" একই সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত ইতিহাস এবং বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার কথা বিশ্ববাসীর কাছে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে প্রবাসীদের আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মাঝে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের রেমিট্যান্সের অবদানের কথা স্মরণ করে এনসিপি মুখপাত্র দেশের নীতি নির্ধারণে তাদের অংশীদারিত্বের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো আগামী দিনের প্রতিটি নির্বাচনেও যেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, তা নিশ্চিত করতে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নিরলসভাবে কাজ করে যাবে। প্রবাসীদের নাগরিক অধিকার সুরক্ষায় এনসিপি সর্বদা সোচ্চার থাকবে বলে তিনি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন এনসিপির যুগ্ম সদস্য সচিব সালেহ উদ্দিন সিফাত। তিনি তার সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে বলেন, "আমি মূলত দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহাসিক 'গোয়াংজু ডেমোক্রেসি ফোরামে' অংশ নিতে এসেছিলাম। এখানকার দীর্ঘ গণতান্ত্রিক লড়াই এবং জনগণের অভ্যুত্থানের ইতিহাস আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটের সাথে অনেকখানি মিলে যায়। কোরিয়া প্রবাসী বাংলাদেশিরা জুলাই অভ্যুত্থানে অভাবনীয় সাহসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। আমরা চাই, শুধু আন্দোলন-সংগ্রামেই নয়, আগামী দিনে বাংলাদেশের রাষ্ট্র পরিচালনার মূল নীতি নির্ধারণেও প্রবাসীরা সরাসরি ভূমিকা রাখুক।" তিনি আরও জানান, বাংলাদেশের মানুষের এই গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের গল্প খুব শীঘ্রই বিশ্বমঞ্চে আরও বড় পরিসরে তুলে ধরা হবে।
সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে দক্ষিণ কোরিয়ায় কর্মরত ও অধ্যয়নরত বাংলাদেশিরা তাদের প্রাত্যহিক জীবনের নানা সমস্যা ও সংকটের কথা এনসিপি নেতাদের সামনে তুলে ধরেন। প্রবাসীদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল:
দক্ষিণ কোরিয়ায় কোনো বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বা রেমিট্যান্স যোদ্ধার আকস্মিক মৃত্যু হলে তার মরদেহ সম্পূর্ণ সরকারি খরচে এবং বিনামূল্যে দেশে পাঠানোর স্থায়ী ব্যবস্থা করা।
কোরিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের অভিবাসন প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বচ্ছ করা।
ভিসা প্রসেসিং ও কোরিয়া গমনের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল চক্রের অপতৎপরতা কঠোর হস্তে দমন করা।
ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের অন্যান্য বিমানবন্দরে প্রবাসীদের অনাকাঙ্ক্ষিত হয়রানি ও অবহেলা বন্ধ করা।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নানা উন্নয়নমূলক খাত এবং নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় প্রবাসীদের অধিকতর অন্তর্ভুক্তির সুযোগ সৃষ্টি করা।
এনসিপি নেতৃবৃন্দ প্রবাসীদের এই যৌক্তিক দাবিগুলো গভীর মনোযোগের সাথে শোনেন এবং বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনা করে এসব সংকট দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও বক্তব্য রাখেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সদস্য আয়মান রাহাত, এনসিপি ডায়াস্পোরা অ্যালায়েন্স দক্ষিণ কোরিয়ার সম্মানিত আহ্বায়ক আরিফুর রহমান এবং সদস্য সচিব বাবুল মিয়া। বক্তারা প্রবাসে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করতে সবাইকে একসাথে কাজ করার আহ্বান জানান। অনুষ্ঠান শেষে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে এনসিপি মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.