ঢালিউডের অমর নায়ক সালমান শাহর রহস্যজনক মৃত্যুর তিন দশক হতে চললেও এখনো কাটেনি ধোঁয়াশা। সালমান শাহকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগে তার স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ২৩ জুন নতুন দিন ধার্য করেছেন আদালত।
বৃহস্পতিবার (১৪ মে) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জুয়েল রানার আদালতে এই বহুল আলোচিত মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের কথা ছিল। তবে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন দাখিল করতে না পারায় বিচারক নতুন এই তারিখ নির্ধারণ করেন। এর ফলে সালমান শাহর কোটি ভক্ত এবং তার পরিবারের দীর্ঘদিনের আইনি লড়াইয়ের অবসান ঘটতে আরও কিছুটা সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকাই চলচ্চিত্রের তৎকালীন শীর্ষ নায়ক সালমান শাহর আকস্মিক মৃত্যুর পর রমনা থানায় একটি অপমৃত্যু মামলা দায়ের করা হয়েছিল। দীর্ঘ সময় ধরে সেই মামলাটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড— তা নিয়ে আইনি ও সামাজিক বিতর্ক চলেছে। তবে গত বছরের ২০ অক্টোবর দেশের বিচার ব্যবস্থায় এবং এই মামলার ইতিহাসে একটি বড় মোড় আসে। ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদী পক্ষের করা রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করে ঘটনাটিকে 'হত্যা মামলা' হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
আদালতের সেই ঐতিহাসিক নির্দেশনার পর, ২১ অক্টোবর সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর বাদী হয়ে রমনা থানায় একটি সুনির্দিষ্ট হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলাটিতে অভিযুক্ত ১১ আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় পূর্বপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড এবং সাধারণ অভিপ্রায়ে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার এজাহারে সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বরের সেই ভয়াবহ দিনের এক মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলে ধরেছেন। তিনি জানান, ঘটনার দিন সালমান শাহর মা নিলুফার জামান চৌধুরী (নীলা চৌধুরী), বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী এবং তাদের ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমানের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের জানানো হয় যে সালমান ঘুমাচ্ছেন।
কিন্তু এর কিছুক্ষণ পরেই প্রোডাকশন ম্যানেজার সেলিমের একটি রহস্যময় ফোন আসে। সেলিম ফোনে জানান, সালমানের কিছু একটা হয়েছে। এই খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা দ্রুত সালমানের শয়নকক্ষে ছুটে যান। সেখানে গিয়ে তারা দেখতে পান, দেশের এক নম্বর মেগাস্টার নিথর অবস্থায় বিছানায় পড়ে আছেন। আরও অদ্ভুত বিষয় ছিল, কয়েকজন বহিরাগত নারী তখন সালমানের হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের ঘরে সামিরার আত্মীয় রুবি চুপচাপ বসে ছিলেন।
এজাহারে আরও উল্লেখ করা হয়, সালমানের মা নীলা চৌধুরী চিৎকার করে ছেলেকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার অনুরোধ জানান। হাসপাতালে নেওয়ার পথেই পরিবারের সদস্যরা সালমানের গলায় স্পষ্ট দড়ির দাগ দেখতে পান। শুধু তাই নয়, তার মুখমণ্ডল ও পায়ে রহস্যময় নীলচে দাগও দৃশ্যমান ছিল।
আশঙ্কাজনক অবস্থায় সালমান শাহকে প্রথমে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু সেখানে অবস্থার কোনো উন্নতি না দেখে পরবর্তীতে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) স্থানান্তরিত করা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসকরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে জানান, সালমান শাহ অনেক আগেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছেন। সালমান শাহর বাবার মৃত্যুর পর এখন তার মামা মোহাম্মদ আলমগীর বোনের পাশে দাঁড়িয়ে এই আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।
সালমান শাহর বাবা কমর উদ্দীন আহমদ চৌধুরী জীবিত থাকাকালীনই এই মৃত্যুকে সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে সন্দেহ করেছিলেন। সেই প্রেক্ষিতেই ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনি একটি দরখাস্ত দাখিল করেছিলেন। যেখানে রমনা থানার অপমৃত্যু মামলাটি দণ্ডবিধির ৩০২/৩৪ ধারায় হত্যা মামলা হিসেবে গ্রহণ করে সিআইডির মাধ্যমে অধিকতর তদন্তের আবেদন জানানো হয়েছিল।
বর্তমান এই হত্যা মামলায় দেশের চলচ্চিত্র ও অপরাধ জগতের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এজাহারভুক্ত প্রধান আসামিরা হলেন— সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, বিতর্কিত চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, চলচ্চিত্র খলঅভিনেতা ডন, লতিফা হক লুছি, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু এবং রেজভি আহমেদ ফরহাদ। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও অনেককে আসামি করা হয়েছে। তবে আইনি নিয়মানুযায়ী, মামলায় অভিযুক্তদের মধ্যে কেউ ইতিমধ্যে মৃত্যুবরণ করে থাকলে, উপযুক্ত প্রমাণ সাপেক্ষে তারা এই মামলার দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন।
ঢালিউড ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই রাজপুত্রের মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটনে এখন দেশবাসীর নজর আগামী ২৩ জুনের তদন্ত প্রতিবেদনের দিকে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.