রাজধানী ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে প্রধান সড়ক—সবখানেই এখন রাজত্ব করছে ব্যাটারিচালিত রিকশা। নিবন্ধনহীন ও যান্ত্রিক এসব যানবাহনের বেপরোয়া চলাচলে একদিকে যেমন বাড়ছে দুর্ঘটনা, অন্যদিকে তীব্র হচ্ছে যানজট। চালকদের নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ কিংবা ড্রাইভিং লাইসেন্স, অথচ প্রায় ১০ লাখ এমন রিকশা এখন রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কগুলো দখল করে রেখেছে।
এই চরম বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এবং সড়কের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আগামী ১৪ মে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, ডিএমপি এবং ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে জরুরি বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, রাজধানীতে প্রায় ১৩ হাজার অবৈধ গ্যারেজ গড়ে উঠেছে, যেখানে ব্যাটারিচালিত রিকশা চার্জ দেওয়া হয়। এসব গ্যারেজে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ ব্যয় হচ্ছে, যার সিংহভাগই অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের মাধ্যমে নেওয়া। তথ্যানুযায়ী, ৬৫ হাজারেরও বেশি চার্জিং পয়েন্টের মধ্যে বৈধ মিটারের সংখ্যা মাত্র ২ হাজারের কিছু বেশি। আবাসিক লাইন ও চোরাই সংযোগের মাধ্যমে বড় ধরনের বিদ্যুৎ চুরির ঘটনা ঘটলেও সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থাগুলোর (ডিপিডিসি) তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
গ্যারেজ মালিকরা রিকশা প্রতি প্রতিদিন ৭০ থেকে ১৫০ টাকা চার্জিং ফি নিলেও সেই অর্থ সরকারের কোষাগারে যাচ্ছে না। উল্টো লোডশেডিংয়ের এই সময়ে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ অপচয় নগরবাসীর ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক এ বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে জানান, কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই এসব রিকশা চালানোর ফলে পথচারী ও যাত্রীরা প্রতিনিয়ত মারাত্মক আহত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকছেন। গত দুই বছরে এই বাহনের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বাড়লেও তা নিয়ন্ত্রণে কর্তৃপক্ষ হিমশিম খাচ্ছে। বিশেষ করে প্রভাবশালী মহলের মদতে এসব রিকশা চলাচল করায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান জানান, ব্যাটারিচালিত রিকশা যানজটের অন্যতম প্রধান কারণ। সাধারণ মানুষের ভোগান্তি লাঘবে ট্রাফিক বিভাগ ও ডিএমপির সাথে আলোচনা চলছে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে আসন্ন বৈঠকের মাধ্যমে একটি স্থায়ী ও কার্যকরী সমাধানের আশা করছেন তিনি।
মিরপুর, তেজগাঁও, যাত্রাবাড়ী ও কামরাঙ্গীরচরসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হাজার হাজার গ্যারেজ গড়ে উঠলেও দৃশ্যমান কোনো অভিযান চোখে পড়ছে না। পুলিশ দাবি করছে, তারা নিয়মিত ডাম্পিং ও জরিমানা করছে, কিন্তু চালক ও মালিকদের দাবি—জীবনধারণের প্রয়োজনে তাদের একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালা করে দেওয়া হোক।
তবে নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, অপরিকল্পিত এই পরিবহন ব্যবস্থা শুধু বিদ্যুৎ সংকটই নয়, বরং ঢাকার ট্রাফিক ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিচ্ছে। ১৪ মে'র উচ্চপর্যায়ের বৈঠক থেকেই এই সংকট উত্তরণের দিকনির্দেশনা আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.