মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির মোকাবিলায় ইরান কেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছে, তার পেছনে নতুন এক সমীকরণ সামনে এনেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম 'দ্য ইকোনমিস্ট'। প্রভাবশালী এই সাময়িকীটি একটি অতি গোপনীয় নথির বরাতে দাবি করেছে, পারস্য উপসাগরে মোতায়েন থাকা মার্কিন সেনাদের লক্ষ্যবস্তু বানাতে ইরানকে উচ্চপ্রযুক্তির জ্যাম-প্রতিরোধী ড্রোন সরবরাহ ও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে রাশিয়া।
এতদিন মনে করা হতো ক্রেমলিন কেবল গোয়েন্দা তথ্য দিয়ে তেহরানকে সহায়তা করছে। তবে নতুন ফাঁস হওয়া এই নথিতে দেখা যাচ্ছে, ভ্লাদিমির পুতিনের প্রশাসন ইরানকে এমন সব মারণাস্ত্র দেওয়ার পরিকল্পনা করেছে, যা মার্কিন ও তাদের মিত্র বাহিনীর জন্য ভয়াবহ প্রাণহানির কারণ হতে পারে।
রুশ গোয়েন্দা সংস্থা জিআরইউ-এর তৈরি করা ১০ পৃষ্ঠার ওই খসড়া প্রস্তাবে ইরানকে ৫ হাজার স্বল্পপাল্লার ‘ফাইবার-অপ্টিক’ ড্রোন এবং উল্লেখযোগ্য সংখ্যক দূরপাল্লার স্যাটেলাইট-নিয়ন্ত্রিত ড্রোন দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এই ড্রোনগুলো বর্তমানে ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার প্রধান অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। নথিতে ড্রোন পরিচালনার জন্য ইরানি বাহিনীকে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ দেওয়ার রূপরেখাও তুলে ধরা হয়েছে।
ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে যখন তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের তেল টার্মিনাল ‘খারগ দ্বীপ’ দখলের পরিকল্পনা করছিলেন, ঠিক সেই সময়েই রাশিয়া এই প্রতিরক্ষা সহযোগিতার প্রস্তাব তৈরি করে। যদিও এই অস্ত্রগুলো শেষ পর্যন্ত ইরানের হাতে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে এখনও নিশ্চিত কোনো তথ্য মেলেনি।
[caption id="attachment_1496" align="alignright" width="622"] ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের পতাকা ছবি: এআই দিয়ে তৈরি[/caption]
ফাইবার-অপ্টিক ড্রোন মূলত বেতার তরঙ্গের পরিবর্তে তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, শত্রুপক্ষ কোনোভাবেই এর সিগন্যাল জ্যাম করতে পারে না। প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যভেদে সক্ষম এই ড্রোনগুলো বর্তমানে ইউক্রেন রণাঙ্গনে ত্রাস সৃষ্টি করেছে।
সম্প্রতি লেবাননের হিজবুল্লাহর কাছেও এ ধরনের ড্রোনের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, যা তারা ইসরায়েলি বাহিনীর ওপর ব্যবহারে করছে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ইরান যদি রাশিয়ার এই প্রযুক্তি পুরোপুরি রপ্ত করতে পারে, তবে পারস্য উপসাগরে মার্কিন ল্যান্ডিং ক্রাফট বা নৌযানগুলোর টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।
রাশিয়ার এই পরিকল্পনার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো স্টারলিংক টার্মিনাল যুক্ত দূরপাল্লার ড্রোন। ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ফাঁকি দিতে মস্কো এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। মধ্যপ্রাচ্যে স্টারলিংক ব্যবহারের ওপর রাশিয়ার তেমন কোনো আইনি বাধা নেই, যা ইরানকে এক বাড়তি সুবিধা দিতে পারে।
এছাড়া প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রেও রাশিয়া এক অভিনব প্রস্তাব দিয়েছে। রুশ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ুয়া প্রায় ১০ হাজার ইরানি শিক্ষার্থী এবং রুশ-পার্সি ভাষায় দক্ষ সিরীয় ও তাজিক যোদ্ধাদের মধ্য থেকে ড্রোন অপারেটর নিয়োগের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এতে রাশিয়ার সরাসরি সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করার সুযোগ থাকবে, ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর ঝুঁকিও কমবে।
আঞ্চলিক গোয়েন্দা সূত্রগুলোর মতে, এই নথিটি রাশিয়া ও ইরানের ক্রমবর্ধমান সামরিক ঘনিষ্ঠতার এক অকাট্য প্রমাণ। ২০২২ সাল থেকে মস্কো তেহরানের কাছ থেকে শাহেদ ড্রোন কেনা শুরু করলেও, বর্তমানে তারা নিজেরাই এর উন্নত সংস্করণ তৈরি করছে। এখন উল্টো রাশিয়া তাদের অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ইরানকে দিয়ে মার্কিন প্রভাব বলয়কে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে।
যদিও ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার নিজস্ব সম্পদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তবুও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে দেওয়া তাদের এই সীমিত কারিগরি সহায়তা যে কোনো মার্কিন অভিযানকে অত্যন্ত জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.