
ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যকার বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে একটি সুসংহত এবং মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে ফিরিয়ে নিতে পরিকল্পিত উদ্যোগ গ্রহণ করেছে ভারত। গত দেড় বছর ধরে ঝিমিয়ে পড়া বিভিন্ন দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়াগুলোকে পুনরায় সচল করার মাধ্যমে দুই নিকট প্রতিবেশীর আস্থা পুনর্গঠনই এখন দিল্লির প্রধান লক্ষ্য।
গত সোমবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সফররত বাংলাদেশি সাংবাদিকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি এসব তথ্য জানান। তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, দুই দেশের আগামীর সম্পর্ক হবে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও জাতীয় সংবেদনশীলতার ভিত্তিতে।
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে স্থবিরতা তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে ভারত এখন অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে কাজ করছে। বিক্রম মিশ্রি জানান, সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রায় ৪০টিরও বেশি দ্বিপক্ষীয় প্রক্রিয়া রয়েছে। এগুলোকে ধাপে ধাপে সক্রিয় করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে রাজনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ স্থাপিত হয়েছে এবং প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা পুনরুদ্ধারে উভয় পক্ষই একমত হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপি সরকারকে স্বাগত জানানো এবং তারেক রহমানের শপথ অনুষ্ঠানে ভারতীয় স্পিকারের উপস্থিতি দিল্লির ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ বলে মনে করা হচ্ছে।
[caption id="attachment_1503" align="alignright" width="622"]
মতবিনিময় সভায় কথা বলছেন ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বিক্রম মিশ্রি। গত সোমবার বিকেলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে ছবি: ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়[/caption]
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান দুই দেশের সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে কি না—এমন প্রশ্নের উত্তরে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব বেশ কূটনৈতিক অবস্থান ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির ইস্যু ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের ওপর ছায়া ফেলবে না। ভারতের সম্পর্ক মূলত বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে, কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের সঙ্গে নয়।
তিনি আরও দাবি করেন, ভারত অতীতে কোনো নির্দিষ্ট দলের হয়ে 'ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং' বা নির্বাচনী কারসাজিতে সহায়তা করেনি। বাংলাদেশে যখন যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে, ভারত তাদের সঙ্গেই জনগণের স্বার্থে কাজ করে যাবে।
গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ এ বছরের ডিসেম্বরে শেষ হতে যাচ্ছে। এ বিষয়ে বিক্রম মিশ্রি আশ্বস্ত করে বলেন, বিদ্যমান কাঠামোর মাধ্যমেই এই সংকটের সমাধান হবে। তিস্তা চুক্তি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতির ওপর মন্তব্য করতে না চাইলেও তিনি জানান, তিস্তা মহাপরিকল্পনা নিয়ে ভারতের পক্ষ থেকে একটি সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা চাইলে এ বিষয়ে দ্রুত আলোচনা শুরু করতে প্রস্তুত নয়াদিল্লি।
সার্ক পুনরুজ্জীবিত করার আলোচনা নিয়ে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব কিছুটা নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, একটি বিশেষ রাষ্ট্রের কারণে এই অঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ ছড়িয়ে পড়ায় সার্ক স্থবির হয়ে আছে। তাই বর্তমানে ভারত আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে 'বিমসটেক' (BIMSTEC)-কে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ বর্তমানে এই জোটের সভাপতির দায়িত্বে থাকায় সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের উন্নয়ন নিয়ে বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশ কোন দেশের সঙ্গে কী ধরনের সম্পর্ক রাখবে, তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে কোনো নেতিবাচক উদ্যোগ যেন দুই দেশের ইতিবাচক সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সেদিকে নজর রাখা জরুরি।
বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভারতীয় ভিসা সেবা দ্রুত স্বাভাবিক করতে ভারত কাজ করছে বলে জানানো হয়। এছাড়া ভারতের দেওয়া ঋণের (লাইন অব ক্রেডিট) বিষয়ে নতুন সরকারের অগ্রাধিকার অনুযায়ী প্রকল্প পুনর্বিন্যাসের সুযোগ রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। সীমান্তে বিএসএফ কর্তৃক সাপ বা কুমির ছাড়ার গুজবকে সম্পূর্ণ নাকচ করে দিয়ে তিনি বলেন, এটি ভারত সরকারের কোনো অবস্থান নয়।
ভারতের পররাষ্ট্রসচিবের এই বক্তব্যে এটা স্পষ্ট যে, দিল্লি এখন বাংলাদেশের সঙ্গে একটি টেকসই এবং ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে চায়। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে দুই দেশ এখন ধীরলয়ে হলেও আস্থার পথে হাঁটছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.