দীর্ঘদিনের সংঘাত ও উত্তেজনা নিরসনে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ঐতিহাসিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। হোয়াইট হাউসের বরাত দিয়ে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, যুদ্ধ বন্ধ এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার লক্ষ্যে এক পৃষ্ঠার একটি খসড়া চুক্তির খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে দুই দেশ। দুই মার্কিন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কিছু অমীমাংসিত বিষয়ে তেহরানের কাছ থেকে চূড়ান্ত জবাব পেতে পারে ওয়াশিংটন।
বর্তমান খসড়া অনুযায়ী, একটি ১৪ দফার সমঝোতা স্মারক নিয়ে উভয় পক্ষ দর-কষাকষি করছে। এর আওতায় প্রাথমিকভাবে অঞ্চলে যুদ্ধের অবসান ঘোষণা করা হবে। এরপর শুরু হবে ৩০ দিনের একটি নিবিড় কূটনৈতিক পরিক্রমা। এই সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত করা, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সীমিত করা এবং মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলোতে চূড়ান্ত ঐকমত্যে পৌঁছানোর চেষ্টা করা হবে। আলোচনাটি জেনেভা অথবা ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হতে পারে বলে জানা গেছে।
চুক্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হিসেবে ইরান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার প্রতিশ্রুতি দেবে। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র পর্যায়ক্রমে অবরোধ তুলে নেবে এবং বিভিন্ন দেশে আটকে থাকা ইরানের শত শত কোটি ডলার অর্থ ছাড় দেবে। এছাড়া, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর থাকা সব ধরণের বিধিনিষেধও তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ স্থগিত রাখার মেয়াদ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে সূক্ষ্ম দর-কষাকষি চলছে। ওয়াশিংটন ২০ বছরের মেয়াদের দাবিতে অনড় থাকলেও ইরান ৫ বছরের প্রস্তাব দিয়েছিল; তবে সূত্রমতে, এই মেয়াদ ১২ থেকে ১৫ বছর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এছাড়া সমঝোতা অনুযায়ী ইরান অঙ্গীকার করবে যে, তারা কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না এবং জাতিসংঘের পরিদর্শকদের যেকোনো সময় স্থাপনা পরিদর্শনের সুযোগ (স্ন্যাপ ইন্সপেকশন) দেবে। অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো, ইরান তাদের কাছে থাকা উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিতেও প্রাথমিকভাবে সম্মতি জানিয়েছে।
আলোচনায় অগ্রগতি হওয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হরমুজ প্রণালিতে সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা থেকে আপাতত সরে এসেছেন। ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনার সরাসরি এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ইরানি কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
তবে এই সমঝোতা নিয়ে খোদ মার্কিন প্রশাসনের মধ্যেই কিছুটা সংশয় রয়েছে। হোয়াইট হাউস মনে করছে, ইরানের বর্তমান নেতৃত্ব রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত, যার ফলে চূড়ান্ত ঐকমত্য তৈরি করা কঠিন হতে পারে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বিষয়টিকে অত্যন্ত জটিল ও কৌশলগত বলে অভিহিত করেছেন। তিনি কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিলেও ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের মানসিকতা নিয়ে কিছুটা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
পরিশেষে, এই এক পৃষ্ঠার সমঝোতা স্মারকটি যদি আলোর মুখ দেখে, তবে তা মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে। তবে আলোচনা ব্যর্থ হলে পুনরায় সামরিক পদক্ষেপ ও অর্থনৈতিক অবরোধের ঝুঁকি থেকেই যাচ্ছে।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.