তামিল চলচ্চিত্রের অবিসংবাদিত সম্রাট থালাপতি বিজয়কে দর্শকরা এত দিন দেখেছেন পর্দায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়তে। তাঁর প্রতিটি সংলাপ আর বীরোচিত অঙ্গভঙ্গি শোষিত মানুষের মনে আশার আলো জাগাতো। কিন্তু সেই সেলুলয়েডের নায়ক যখন বাস্তব জীবনের রাজনীতির ময়দানে পা রাখলেন, তখন সেখানেও তৈরি হলো এক নতুন ইতিহাস। দীর্ঘ তিন দশকের অভিনয় ক্যারিয়ারের ইতি টেনে মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে বিজয় প্রমাণ করলেন, তাঁর জনপ্রিয়তা কেবল সিনেমা হলের টিকিটে সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা ব্যালট বাক্সেও ঝড় তুলতে সক্ষম।
থালাপতি বিজয়ের রাজনৈতিক অভিযাত্রার আনুষ্ঠানিক সূচনা হয় ২০২৪ সালে, তাঁর দল তামিলাগা ভেত্রি কাজাগাম (টিভিকে) গঠনের মধ্য দিয়ে। বিজয়ের আসল নাম জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর হলেও ভক্তদের কাছে তিনি ‘থালাপতি’ বা সেনাপতি নামেই সমধিক পরিচিত। রাজনীতিতে পা রেখেই তিনি তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন। একদিকে তামিলনাড়ুর সাধারণ মানুষের অধিকার রক্ষা, অন্যদিকে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের দমনমূলক নীতির কড়া সমালোচনা—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন আপসহীন। বিশেষ করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সমালোচনা করে তাঁর দেওয়া জ্বালাময়ী ভাষণগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে, যা তরুণ ভোটারদের কাছে তাঁকে একজন নির্ভীক নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
তামিলনাড়ু বিধানসভার সাম্প্রতিক নির্বাচনে বিজয়ের দল টিভিকে অভাবনীয় চমক দেখিয়েছে। রাজ্যের ২৩৪টি আসনের মধ্যে তাঁর দল এককভাবে ১০৭টি আসনে জয়লাভ করেছে। যদিও সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসনের ম্যাজিক ফিগার তারা ছুঁতে পারেনি, তবুও একক বৃহত্তম দল হিসেবে টিভিকে-র এই উত্থান প্রথাগত রাজনীতির হিসাব-নিকাশ পাল্টে দিয়েছে। এখন সমমনা দলগুলোর সমর্থন নিয়ে বিজয় যদি সরকার গঠন করেন, তবে দীর্ঘ ৪৯ বছর পর তামিলনাড়ু দেখবে এক চলচ্চিত্র তারকার মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার গৌরবোজ্জ্বল মুহূর্ত। এর আগে ১৯৭৭ সালে কিংবদন্তি অভিনেতা এম জি রামচন্দ্রন (এমজিআর) সরাসরি রুপালি পর্দা থেকে এসে মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসেছিলেন এবং টানা ১০ বছর রাজত্ব করেছিলেন।
[caption id="attachment_1464" align="alignleft" width="622"] দক্ষিণ ভারতে এক রাজনৈতিক সমাবেশে বক্তব্য দিচ্ছেন অভিনেতা ও রাজনীতিক জোসেফ বিজয় চন্দ্রশেখর, যিনি ‘থালাপতি বিজয়’ নামেই সর্বাধিক পরিচিত ছবি: রয়টার্স[/caption]
বিজয় হুট করেই রাজনীতিতে আসেননি, বরং তাঁর এই সফর ছিল দীর্ঘ পরিকল্পিত। ২০০৯ সালে তিনি তাঁর বিভিন্ন ফ্যান ক্লাবগুলোকে একত্রিত করে ‘বিজয় মাক্কাল ইয়াক্কাম’ নামে একটি সংগঠনে রূপ দেন। শুরুতে এটি সমাজসেবামূলক কাজ যেমন—শিক্ষাসামগ্রী বিতরণ ও ত্রাণ তৎপরতায় যুক্ত থাকলেও ধীরে ধীরে তা রাজনৈতিক ভিত তৈরি করতে থাকে। ২০১১ সালে এআইএডিএমকে জোটকে সমর্থন দিয়ে তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রভাবের পরীক্ষা নেন। এরপর নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর বিরোধিতা এবং সিনেমার অনুষ্ঠানে বেকারত্ব ও দুর্নীতির মতো জনগুরুত্বপূর্ণ ইস্যু নিয়ে কথা বলে তিনি নিজেকে মূলধারার নেতা হিসেবে তুলে ধরেন।
থালাপতি বিজয়ের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্ত ছিল রাজনীতির জন্য অভিনয় জগতকে চিরতরে বিদায় জানানো। প্রায় ৭০টি হিট সিনেমা উপহার দেওয়ার পর তিনি যখন অবসরের ঘোষণা দেন, তখন ভক্তরা বুঝেছিল—রাজনীতি তাঁর কাছে কোনো শখের কাজ নয়, বরং মানুষের সেবা করার এক গভীর অঙ্গীকার। ২০২১ সালের স্থানীয় নির্বাচনে তাঁর সংগঠনের ব্যাপক সাফল্যই মূলত টিভিকে গঠনের আত্মবিশ্বাস জুগিয়েছিল। তিনি কোনো বড় দলের লেজুড়বৃত্তি না করে ডিএমকে এবং এআইএডিএমকে-র বিকল্প হিসেবে একটি ‘পরিচ্ছন্ন রাজনৈতিক মঞ্চ’ উপহার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
বিজয়ের এই পথচলা কুসুমাস্তীর্ণ ছিল না। ২০২৫ সালে তাঁর একটি রাজনৈতিক সমাবেশে অনাকাঙ্ক্ষিত পদদলিত হওয়ার ঘটনায় প্রাণহানি ঘটলে তাঁর নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। তবে সেই সংকটকালে বিজয়ের দায়িত্বশীল আচরণ এবং ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়ার মানসিকতা সাধারণ মানুষের মন জয় করে নেয়। তিনি প্রমাণ করেন যে কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও তিনি ধীরস্থিরভাবে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম।
তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে জয়ললিতার মতো তারকারা বড় দলের উত্তরাধিকারী হয়ে ক্ষমতায় এলেও, থালাপতি বিজয় নিজের দল গড়ে যে সাফল্য দেখিয়েছেন তা বর্তমান সময়ে বিরল। সিনেমার পর্দার সেই প্রতিবাদী নায়ক এখন বাস্তবের মাটিতে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষের ভাগ্য বদলের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। এখন দেখার বিষয়, জোট গঠনের সমীকরণে শেষ পর্যন্ত তিনি তামিলনাড়ুর মসনদে বসে এমজিআরের সেই সোনালী যুগের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে পারেন কি না।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.