
চার বছরের একটি শিশু। যার হাতে থাকার কথা ছিল নতুন বই, আর মুখে বন্ধুদের সাথে খুনসুটির গল্প। কিন্তু তার মুখে এখন একটাই আতঙ্কিত স্বর— "স্কুল পচা, স্কুলে আর যাব না।" রাজধানীর নয়াপল্টনের একটি কিন্ডারগার্টেনে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হওয়ার পর থেকে শিশুটি আতঙ্কে সিঁটিয়ে আছে। সামান্য শব্দেই সে কেঁপে ওঠে, খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়েছে। আজ ৩০ এপ্রিল, আন্তর্জাতিক শিশু শাস্তি বিলোপ দিবস। যখন বিশ্বজুড়ে শিশুদের প্রতি সহিংসতা বন্ধের আওয়াজ উঠছে, তখন বাংলাদেশের বাস্তবতায় এই শিশুটির আর্তনাদ যেন এক গভীর ক্ষতকে সামনে নিয়ে এসেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফের ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে, ২০২৫’-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন এক উদ্বেগজনক তথ্য দিচ্ছে। জরিপের আগের এক মাসে ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে ৮৬ শতাংশই শারীরিক বা মানসিক শাস্তির শিকার হয়েছে।
৩ থেকে ৯ বছর: এই বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে। তাদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ শারীরিক এবং ৩৩ শতাংশ গুরুতর শারীরিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে।
নির্যাতনের ধরণ: চড়-থাপ্পড়, মাথায় বা কানে আঘাত এবং বারবার শরীরে প্রহারের মতো ঘটনা এখন নিত্যনৈমিত্তিক।
[caption id="attachment_1377" align="alignright" width="622"]
ছবি- অনলাইন থেকে সংগৃহীত[/caption]
বাংলাদেশে শিশু আইন ২০১৩-এর ৭০ ধারা অনুযায়ী, শিশুর ওপর শারীরিক বা মানসিক আঘাত করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এর শাস্তি সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড বা এক লাখ টাকা জরিমানা। এছাড়া ২০১১ সাল থেকেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শাস্তি রহিতকরণ নীতিমালা কার্যকর রয়েছে।
তা সত্ত্বেও কেন বন্ধ হচ্ছে না এই নিষ্ঠুরতা? প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ স্বীকার করেছেন যে, বিপুল সংখ্যক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে কিন্ডারগার্টেনগুলো তদারকি করার মতো পর্যাপ্ত সক্ষমতা সরকারের নেই। অন্যদিকে, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আরিফুর রহমান মজুমদার জানান, কওমি বা ব্যক্তিগত মাদ্রাসার ওপর সরকারের নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সেখানে নীতিমালা কার্যকর করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা খবরগুলো শিউরে ওঠার মতো:
দৃষ্টিশক্তি হারানো ফারহান: কুমিল্লার তিতাসে শিক্ষকের ছুড়ে মারা স্কেলের আঘাতে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিশু চিরতরে তার ডান চোখের দৃষ্টি হারিয়েছে।
মৃত্যুর অভিযোগ: লক্ষ্মীপুর ও ঢাকায় মাদ্রাসার টয়লেট থেকে শিশুদের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। পরিবারের অভিযোগ, পড়াশোনার চাপে ও শিক্ষকদের মারধরের কারণেই এই করুণ পরিণতি।
কান ধরিয়ে ওঠবস: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে শিশুদের কান ধরিয়ে ওঠবস করানোর ভিডিও ভাইরাল হলে সামাজিক মাধ্যমে তীব্র সমালোচনার ঝড় ওঠে।
[caption id="attachment_1378" align="alignright" width="622"]
কিশোর ও তরুণদের কান ধরিয়ে ওঠবস করাচ্ছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সদস্য সর্বমিত্র চাকমাফাইল ছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া[/caption]
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, শারীরিক শাস্তি শিশুর আচরণ সংশোধন করে না; বরং তাদের মধ্যে মিথ্যা বলা, চুরি এবং পরবর্তী জীবনে অপরাধ প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। এটি শিশুদের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয় এবং তাদের মানসিক বিকাশে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
‘শিশুরাই সব’ সংগঠনের আহ্বায়ক লায়লা খন্দকার বলেন, "শাস্তি দিয়ে শিশুকে সঠিক আচরণ শেখানো যায় না। শিক্ষকের ব্যক্তিগত ক্ষোভ শিশুর ওপর ঝাড়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। শিশুদের মানবাধিকার আছে এবং তাদের সাথে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।"
স্কুল বা মাদ্রাসা হওয়া উচিত ছিল আনন্দের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু বেত্রাঘাত আর কান ধরিয়ে ওঠবসের সংস্কৃতি সেই আনন্দকে বিষাদে রূপ দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক শিশু শাস্তি বিলোপ দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত—শাসন নয়, বরং ভালোবাসা আর বোঝাপড়ার মাধ্যমেই গড়ে উঠবে আগামী প্রজন্ম।
উত্তরপত্র টিভি
Copyright © 2026 Uttorpatro TV. All rights reserved.