হত্যার শিকার শিশু মুরসালিন শেখ ছবি: পিবিআই

২০২২ সালের শেষভাগের একটি ঘটনা। ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার পশ্চিম গোন্দারদিয়া সরদারপাড়া এলাকার চন্দনা-বারাশিয়া নদীর পূর্ব তীরে পাওয়া গিয়েছিল একটি পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের বস্তা। কৌতূহলবশত সেটি খুলতেই চমকে ওঠেন স্থানীয়রা। ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে একটি মানুষের মাথার খুলি, কয়েকটি দাঁত আর কিছু হাড়গোড়। নদী তীরের সেই কঙ্কাল কার, কীভাবে তার মৃত্যু হলো কিংবা কেনই বা মরদেহ এভাবে গোপন করা হলো—তখন তার কোনো উত্তর ছিল না।
শুরুতে মধুখালী থানা-পুলিশ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি ও আসামির বিরুদ্ধে একটি হত্যা মামলা দায়ের করলেও তদন্তে কোনো কূলকিনারা পাচ্ছিল না। অবশেষে ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে মামলার দায়িত্ব নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। একটি নিখোঁজের সাধারণ ডায়েরি (জিডি), ডিএনএ পরীক্ষা এবং বাবা-ছেলের একটি ফোনালাপের সূত্র ধরে প্রায় অসম্ভব এক হত্যাকাণ্ডের রহস্যভেদ করেছে পিবিআই। পরিচয় মিলেছে সেই হতভাগ্য ১১ বছরের শিশু মুরসালিন শেখের, যাকে নির্মমভাবে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দিয়েছিল তার নিজেরই সৎবাবা মিজানুর রহমান।
পিবিআইয়ের তদন্ত কর্মকর্তারা দায়িত্ব পাওয়ার পর শুরুতেই ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা পর্যালোচনা করেন। এ সময় সামনে আসে ইতি বেগম নামের এক নারীর করা একটি জিডি। নদী থেকে কঙ্কাল উদ্ধারের মাস ছয়েক আগে মধুখালী থানায় তিনি তাঁর ১১ বছরের ছেলে মুরসালিন শেখ নিখোঁজ হওয়ার কথা জানিয়ে জিডিটি করেছিলেন। ঘটনাস্থল থেকে মুরসালিনের বাড়ির দূরত্ব কাছাকাছি হওয়ায় তদন্তকারীদের মনে সন্দেহের দানা বাঁধে।
এরপর পিবিআইয়ের উদ্যোগে ইতি বেগমের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করা হয় ল্যাব পরীক্ষার জন্য। রিপোর্ট আসতে কিছুটা সময় লাগার মাঝেই হুট করে এলাকা ছেড়ে চলে যান মুরসালিনের সৎবাবা মিজানুর রহমান। কাজের খোঁজে বাইরে যাচ্ছেন বললেও তাঁর এই আকস্মিক প্রস্থান পিবিআইয়ের সন্দেহ আরও বাড়িয়ে দেয়। ২০২৩ সালের জুলাই মাসে আসা ডিএনএ রিপোর্টে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, নদীর তীরে পাওয়া হাড়গোড়গুলো আসলে নিখোঁজ মুরসালিনেরই কঙ্কাল।
ডিএনএ নিশ্চিত হলেও মিজানুরকে আটক করার মতো কোনো প্রত্যক্ষ সাক্ষী বা দৃশ্যমান আলামত ছিল না পিবিআইয়ের হাতে। এই পরিস্থিতিতে পিবিআই প্রধান ও অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোস্তফা কামালের নির্দেশনায় তদন্তকারীরা একটি ভিন্ন কৌশল নেন। তাঁরা মিজানুরের বাবা-মাকে গিয়ে জানান যে, তদন্তে মিজানুরের জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে এবং পালিয়ে থেকেও পার পাওয়া যাবে না।
তদন্তকারীদের এই চাল সফল হয়। মিজানুরের বাবা এক আত্মীয়ের ফোন থেকে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ করে পুলিশের এই সতর্কবার্তা পৌঁছে দেন। বাবা-ছেলের এই ফোনালাপের রেকর্ডটি কৌশলে চলে আসে পিবিআইয়ের হাতে, যেখানে হত্যাকাণ্ডে মিজানুরের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি একদম স্পষ্ট হয়ে যায়। এরপর ২০২৩ সালের জুলাইয়ে মাগুরা থেকে মিজানুরকে গ্রেপ্তার করা হয়। প্রথমে অস্বীকার করলেও তথ্যপ্রমাণের মুখে ভেঙে পড়ে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন তিনি।
তদন্তে জানা যায়, মুরসালিন ছিল ইতি বেগমের প্রথম পক্ষের সন্তান। ইতি বেগমের সঙ্গে বিয়ের পর থেকেই অভাব-অনটন ও মিজানুরের প্রথম পক্ষের স্ত্রীর আপত্তির কারণে পরিবারে কলহ লেগেই থাকত। ২০২২ সালের জুনে ঝগড়া করে ইতি তাঁর ছোট সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় চলে যান এবং মুরসালিনকে রেখে যান তার নানির কাছে।
২০২২ সালের ২৫ জুন সকালে মধুখালীর চেয়ারম্যান ঘাটের কাছে মরিচখেতে কাজ করার সময় মুরসালিনের সঙ্গে দেখা হয় মিজানুরের। ইতি বেগম কোথায় আছেন জানতে চাইলে মুরসালিন কিছু জানে না বলে জানায়। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে মিজানুর মুরসালিনের কানে সজোরে আঘাত করেন। মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কান দিয়ে রক্তক্ষরণ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যায় ১১ বছরের শিশুটি।
আতঙ্কিত মিজানুর প্রথমে মরদেহটি ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে রাখেন। পরে রাতের আঁধারে লাশের পরিচয় পুরোপুরি মুছে ফেলার উদ্দেশ্যে পরনের কাপড় খুলে ফেলে তা একটি প্লাস্টিকের বস্তায় ভরে চন্দনা-বারাশিয়া নদীতে ফেলে দেন। মিজানুর ভেবেছিলেন নদীর স্রোতে লাশ ভেসে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে যাবে, কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে কঙ্কালটি নদীর তীরেই আটকে থাকে এবং শেষ পর্যন্ত সত্যকে সামনে নিয়ে আসে। বর্তমানে ঘাতক সৎবাবা আদালতের মাধ্যমে বিচারের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছেন।