ইসলামিক পরিভাষায় পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশটি রাত যেমন ইবাদতের জন্য শ্রেষ্ঠ রজনী, ঠিক তেমনি জিলহজ মাসের প্রথম দশটি দিন হলো সমগ্র বছরের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও শ্রেষ্ঠ দিন। মহান আল্লাহর কাছে এই দিনগুলোর ইবাদত অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি প্রিয় এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এই বরকতময় সময়ে যাঁরা পবিত্র হজ পালনের জন্য মক্কা নগরীতে উপস্থিত হতে পারেননি, তাঁদের জন্যও মহান আল্লাহ বিপুল সওয়াব অর্জনের পথ খোলা রেখেছেন। জিলহজের এই পুণ্যময় দিনগুলোতে ঘরে বসেই সর্বোচ্চ সওয়াব হাসিলের জন্য ১০টি বিশেষ আমল নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১. আল্লাহর জিকিরে জিহ্বা সিক্ত রাখা পবিত্র হজে গমনকারী ব্যক্তিরা এই দিনগুলোতে সমস্বরে তালবিয়া পাঠ করেন। আর যাঁরা হজে যাওয়ার সুযোগ পাননি, তাঁদের জন্য নির্দেশ হলো এই দিনগুলোতে বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা। সুরা রাদের ২৮ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন যে, একমাত্র আল্লাহর স্মরণের মাধ্যমেই মানুষের অন্তর পরম প্রশান্তি লাভ করে। হাদিস শরিফে এসেছে, ইসলামের নানাবিধ বিধানের মাঝে সবসময় আমল করার মতো সহজ ও কার্যকর মাধ্যম হিসেবে রাসুলুল্লাহ (সা.) সর্বদা জিহ্বাকে আল্লাহর জিকিরে ব্যস্ত রাখার পরামর্শ দিয়েছেন।
ছবিঃ উত্তরপত্র
২. মুক্তহস্তে দান-সদকা করা জিলহজের প্রথম দশকে দান করার সওয়াব বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। নিজের সাধ্য অনুযায়ী অভাবী ও দুস্থ মানুষের মাঝে গোপনে বা প্রকাশ্যে সম্পদ খরচ করা উচিত। সুরা বাকারার আয়াতে বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দিন বা রাতে সম্পদ ব্যয় করে, তাদের জন্য আল্লাহর কাছে বড় পুরস্কার রয়েছে। অর্থের অভাব থাকলে শারীরিক শ্রম বা সেবামূলক কাজের মাধ্যমেও এই সদকার সওয়াব অর্জন করা সম্ভব।
৩. আরাফার দিনের রোজা রাখা জিলহজ মাসের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ৯ জিলহজ তথা আরাফার দিন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, এই বিশেষ দিনে একটি রোজা রাখার ফজিলত অপরিসীম। এই একটি রোজার বিনিময়ে মহান আল্লাহ বান্দার বিগত এক বছর এবং আগামী এক বছরের ছোটখাটো গুনাহ বা অপরাধের কাফফারা করে দেন।
৪. চাশতের নামাজে যত্নবান হওয়া সূর্যোদয় ও যোহরের মধ্যবর্তী সময়ে নফল ইবাদতের এক চমৎকার মাধ্যম হলো চাশতের (দুহা) নামাজ। জিলহজের এই ১০ দিন অন্তত দুই রাকাত করে চাশতের নামাজ আদায়ের অভ্যাস করা উচিত। বুখারি শরিফের সূত্র অনুযায়ী, এই সময়টি নফল ইবাদতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রহর হিসেবে বিবেচিত।
৫. প্রতিবেশীদের মাঝে ঈদের উপহার বিতরণ ইসলামিক সমাজব্যবস্থায় ভ্রাতৃত্ব ও পারস্পরিক সম্প্রীতি বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। মুসলিম শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী, ঈদের এই আনন্দঘন সময়ে প্রতিবেশীদের মাঝে উপহার আদান-প্রদান করা অতিরিক্ত পুণ্য বয়ে আনে।
৬. বেশি বেশি কান্নাকাটি ও দোয়া করা তিরমিজি শরিফের বর্ণনা অনুযায়ী, বছরের সমস্ত দোয়ার মধ্যে সবচেয়ে উত্তম দোয়া হলো আরাফাত দিবসের দোয়া। তাই জিলহজের দিনগুলোতে, বিশেষ করে ৯ জিলহজ বিকেলে নিজের এবং পুরো মুসলিম উম্মাহর কল্যাণে বেশি বেশি ইস্তিগফার ও মোনাজাত করা উচিত।
৭. আগামী বছর হজ পালনের ঐকান্তিক নিয়ত জিলহজের ৮ তারিখ থেকে হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। আর্থিক ও শারীরিকভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য হজ করা এই সময়ের সেরা ইবাদত। তবে যাঁরা এবার যেতে পারেননি, তাঁরা এই পবিত্র দিনগুলোতে আগামী বছর আল্লাহর ঘরে যাওয়ার জন্য মনে মনে দৃঢ় সংকল্প বা নিয়ত করতে পারেন। নিয়তের শুদ্ধতার কারণেও আল্লাহ বান্দাকে পুরস্কৃত করেন।
৮. মানুষের সঙ্গে বিনয়ী ও কোমল আচরণ তিরমিজি শরিফের শিক্ষা অনুযায়ী, মানুষের সাথে দৈনন্দিন মেলামেশায় এবং সাক্ষাতে অতিরিক্ত বিনয়, নম্রতা ও কোমলতা প্রকাশ করা একটি বড় ইবাদত। এই দিনগুলোতে নিজের অহংকার পরিহার করে সবার সাথে সদ্ব্যবহার করলে আমলনামায় বিশেষ সওয়াব যুক্ত হয়।
৯. কোরবানি ও তাকওয়া অর্জন জিলহজ মাসের মূল ইবাদতগুলোর একটি হলো আল্লাহর নামে পশু কোরবানি করা। তবে মনে রাখতে হবে, পশুর রক্ত বা গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, পৌঁছায় কেবল বান্দার হৃদয়ের তাকওয়া বা খোদাভীতি। হজরত জায়েদ ইবনে আরকাম (রা.) বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সা.) উল্লেখ করেছেন, কোরবানি হলো পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর জীবনাদর্শ এবং এর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি দেওয়া হয়।
১০. অন্যকে ভালো কাজে উদ্বুদ্ধ করা নিজে আমল করার পাশাপাশি এই বরকতময় দিনগুলোর ফজিলত ও গুরুত্ব সম্পর্কে পরিবার, বন্ধুবান্ধব এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সবাইকে জানানো উচিত। কারণ, অন্য কাউকে ভালো কাজের পথ দেখালে বা উৎসাহিত করলে সমপরিমাণ সওয়াব নিজের আমলনামাতেও যোগ হয়।
তাই হেলাফেলায় বছরের এই শ্রেষ্ঠ দিনগুলো পার না করে, প্রতিটি মুহূর্তকে ইবাদত ও জনকল্যাণমূলক কাজে নিয়োজিত করাই একজন প্রকৃত মুমিনের লক্ষ্য হওয়া উচিত।