ছবি- উত্তরপত্র টিভি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলের সাবেক ভিপি শেখ তাসনিম আফরোজ ইমির মুক্তি ও আইনি অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক কটাক্ষ ও সাইবার বুলিংয়ের শিকার হচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা। শুক্রবার (৮ মে) রাতে নিজের ভেরিফাইড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এই পরিস্থিতির তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং দেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তাসনিম জারা তার পোস্টে ২০১৩ সালের শাহবাগ আন্দোলনের স্মৃতি স্মরণ করে বলেন, সেই সময় উগ্র স্লোগানের প্রতিবাদ করায় তাকে ‘ছাত্রী সংস্থার প্রোডাক্ট’ হিসেবে তকমা দেওয়া হয়েছিল। সে সময় তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা তাকে নানাভাবে হুমকি দিয়েছিল। অথচ এক দশক পর আজ আবার একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
জারা বলেন, “আগে যারা নির্যাতিত ছিলেন, আজ তারাই আমাকে ‘শাহবাগী’, ‘বাম’ বা ‘ইসলামবিদ্বেষী’ বলে মিথ্যা অপবাদ দিচ্ছেন।” তিনি উল্লেখ করেন, ইমির একটি ফেসবুক পোস্ট শেয়ার করার কারণেই তার ওপর এই আক্রমণ শুরু হয়েছে। ইমি কারাগারে থাকার কারণে তার স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পরীক্ষা দিতে পারেননি, যা তার একাডেমিক জীবনে বড় ক্ষতি ডেকে এনেছে। জারা মনে করেন, আইনের সঠিক প্রয়োগ হলে ইমির মতো একজনকে এভাবে কারাগারে থাকার প্রয়োজন হতো না।
জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে একটি ‘পোস্ট-আইডিওলজিক্যাল’ বা আদর্শ-পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির অঙ্গীকার করা হয়েছিল। তাসনিম জারা বলেন, প্রতিশ্রুতি ছিল যে শাপলা চত্বর বা শাহবাগ—কে কোন ঘরানার তা দিয়ে কাউকে বিচার করা হবে না। দেশ গড়ার কাজে বাম, ডান, আস্তিক, নাস্তিক নির্বিশেষে সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছিল।
তিনি আক্ষেপ করে বলেন, “বলা হয়েছিল মধ্যপন্থার একটি নতুন শক্তি গঠন করা হবে যেখানে আলেম-ওলামা থেকে শুরু করে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অ্যাক্টিভিস্টরা সবাই মিলে দেশ গড়বেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি বলছে সেই জায়গা সংকুচিত হয়ে আসছে। এখন নিজের মতের সামান্য অমিল হলেই মানুষকে ‘পশ্চিমা এজেন্ট’ বা ‘নাস্তিক’ বলে টার্গেট করা হচ্ছে।”
তাসনিম জারা তার পোস্টে রাজনৈতিক ভণ্ডামির চিত্রও তুলে ধরেন। তিনি বলেন, কোনো ব্যক্তি যখন নির্দিষ্ট দলের অনুসারী হন, তখন তিনি ‘পবিত্র’ হয়ে যান, কিন্তু দলের বাইরে গেলেই তাকে ‘চাঁদাবাজ’ বা ‘অপবিত্র’ তকমা দেওয়া হয়।
তিনি কঠোর ভাষায় বলেন, “যে ফ্যাসিবাদকে আমরা পরাজিত করেছি, তার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল ভিন্ন মতকে দেশদ্রোহ বা ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখা। আজ যদি নতুন মোড়কে সেই একই ট্যাগিংয়ের রাজনীতি ফিরে আসে, তবে গণঅভ্যুত্থানের মূল সম্ভাবনা ও লক্ষ্য নষ্ট হয়ে যাবে।”
ব্যক্তিগতভাবে ইমির সাথে তার মতের মিল সব ক্ষেত্রে না থাকলেও, একজন মানুষের ওপর হওয়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলাকে নিজের নৈতিক দায়িত্ব বলে মনে করেন জারা। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ২০১৩ সালে যেমন তিনি অন্যায্য স্লোগানের বিরুদ্ধে অটল ছিলেন, আজও তিনি সেই অবস্থানেই আছেন। সভ্য সমাজে কাউকে বিনা বিচারে আটকে রাখা বা ভিন্ন মতের কারণে তাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করা কদর্যপূর্ণ আচরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।